kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জোট রাজনীতিতে বিএনপি

শরিক দলগুলোতে ভাঙন আছে জোট ছাড়ার খেলা

শফিক সাফি   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শরিক দলগুলোতে ভাঙন আছে জোট ছাড়ার খেলা

জোটের রাজনীতিতে বিএনপির ভাগ্য যেন সুপ্রসন্ন নয়। শরিকদের কেউ নিজেই বিপাকে পড়ে জোট ছেড়ে যাচ্ছে আবার কোনোটি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভেঙে যাচ্ছে। অথচ দু-একটি ছাড়া নামসর্বস্ব এসব দল নিয়ে জোট করে তেমন কোনো লাভ ঘরে তুলতে পারেনি বিএনপি। রাজপথের আন্দোলনেও তাদের বড় কোনো শক্তির জোগান মেলেনি। নির্বাচনে ভোটের মাঠেও তেমন অবদান রাখতে পারেনি দলগুলো। উল্টো শরিকদের এই ভাঙন ও জোট ছাড়ার দায় কোনো না কোনোভাবে বিএনপিকে নিতে হয়েছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি জোটের রাজনীতি শুরু করে। অনেক ভাঙাগড়ার পর নতুন করে চারদলীয় জোট গঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। তার পরে ১৮ দলীয় জোট এবং সর্বশেষ প্রয়াত কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও সাম্যবাদী দলের একাংশ নিয়ে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল গঠিত হয় ২০ দলীয় জোট।

অবশ্য চারদলীয় জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোট এরই মধ্যে তিন ভাগ হয়েছে। চার দলের শরিক থাকা অবস্থায় ভেঙে গেছে জাতীয় পার্টিও। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বড় অংশ বিএনপির জোট ছেড়ে চলে গেলে মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন একাংশ জোটে থেকে যায়।

গত ১০ মে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভেঙে গঠিত হয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি। আর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর জোট ছেড়ে চলে গেছে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। নির্বাচনের আগে দলীয় অন্তঃকলহ এবং মনোনয়ন না পাওয়ায় ২০ দল ছেড়ে চলে যায় এনডিপি ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আবার নির্বাচনের পর দলীয় কলহে ভাগ হয়ে গেছে অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি। অবশ্য উভয় অংশই ২০ দলের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

নামে ২০ দলীয় জোট হলেও এতে দল রয়েছে ২২টি। আর এগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত মাত্র আটটি। এই জোটে প্রথম ভাঙন শুরু হয় ২০১৫ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জোট থেকে বেরিয়ে যায় প্রয়াত শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। নিলুর অভিযোগ ছিল, জোটে বিএনপি-জামায়াত সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। তবে মহাসচিব ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নিজেকে দলটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে জোটে থেকে যান। একই অবস্থা তৈরি হয় এনডিপিতেও।

ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ারুল হক জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও আজহারুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে দলটির আরেক অংশ জোটে থেকে যায়। একইভাবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) নিবন্ধিত অংশ জেবেল রহমান গানি ও এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়ার নেতৃত্বে জোট ত্যাগ করলে শাওন সাদেকীকে ন্যাপের সভাপতি করে জোটে রাখা হয়েছে।

২০১৬ সালে জটিলতা তৈরি হয় ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে। জোটের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী জোট ছেড়ে যান। ঐক্যজোটের সিনিয়র সহসভাপতি ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি আবদুর রকিব নিজেকে ইসলামী ঐক্যজোটের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করে বলেন, ইসলামী ঐক্যজোট ২০ দলীয় জোটের সঙ্গেই আছে।

২০১৯ সালের ৬ মে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়। জাতীয় মুক্তিমঞ্চ ইস্যুতে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও (এলডিপি) ভেঙেছে। ভেঙেছে মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে থাকা লেবার পার্টি। দলটির মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদি লেবার পার্টির একাংশ নিয়ে জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও ইরান রয়ে গেছেন।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টেও চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। এখানে প্রথম ফ্রন্ট ত্যাগ করে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে থাকা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। পরে ভাঙন দেখা দেয় আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে (জেএসডি)।

সর্বশেষ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরামেও ভাঙনের সুর। দলটির একাংশ আগামী ডিসেম্বরে দলের কাউন্সিল আহ্বান করেছে, যাতে ড. কামাল হোসেনের সায় নেই। এর মধ্য দিয়ে কার্যত দলটি ভেঙেই গেছে।

দেশের রাজনীতিতে জোট গড়া ও ছেড়ে যাওয়া এবং অন্তঃকোন্দলে দলে ভাঙনের ঘটনাগুলোকে দলগুলোর নেতাদের কেউ কেউ স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন। আবার কারো কারো মতে, এটি দেশের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এসব ঘটনাকে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান বা হিসাব-নিকাশে বনিবনা না হওয়ার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনীতিতে জোট গঠন ও ভাঙাগড়া চলমান ঘটনা। পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত নানা সময়ে মূলত আন্দোলন ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট হয়েছে। তবে নির্বাচন শেষে সেই জোট ভেঙে যেতে পারে।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘সব দলেই কিছু নেতা চলে যান আবার অনেকে যোগ দেন। এটিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখতে হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশে এখন রাজনীতি নেই। রাজনীতির প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন দেশ চালান সরকারি আমলা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ অবস্থায় কোনো দল ভাঙল না জোড়া লাগল, তাতে কিছু যায় আসে না। তবে দেশে রাজনীতি থাকলে আমি বলব, গণফোরামে যা হয়েছে সেটি একেবারেই ব্যক্তিগত মতবিরোধ ও স্বার্থের কারণে হয়েছে।’

২০ দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির মহাসচিব মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ‘যারা দল ভাঙতে উসকানি দেয় বা প্রলোভন দেখায়, তারাও মন্দ কাজ করে। ২০ দলীয় জোটে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শুভকর হিসেবে দেখছি না। মন্দ লোকেরা এর সুযোগ নেয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা