kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশেষ লেখা

তিনি সব সামলাতেন জ্ঞানের গভীরতায়’

এ এম আমিন উদ্দিন

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিনি সব সামলাতেন জ্ঞানের গভীরতায়’

একজন মানুষের পিতা-মাতাই তার অভিভাবক। গোটা দুনিয়ার চিরাচরিত এই নিয়মের বাইরে আমিও না। আমারও অভিভাবক আমার বাবা-মা। কিন্তু এর বাইরে আরো একটি কথা আছে। আমাকে আমার বাবা-মা জন্ম দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু পেশাগত জীবনে বিশেষ করে আজকে আমার এই অবস্থানে আসা শুধুই সদ্যঃপ্রয়াত রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের জন্য। তিনি ছিলেন আমার পেশাগত অভিভাবক। আজকে আমি সারা দেশের মানুষের কাছে এ এম আমিন উদ্দিন হয়ে ওঠা তাঁর কারণেই। আজ আমি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হয়েছি—এর পেছনেও তাঁরই অবদান।

আমার এই অভিভাবককে আজ আমি চিরবিদায় দিয়ে এসেছি। আজ আমি অভিভাবকহীন হয়ে গেলাম। আর কেউ আমাকে ডেকে বলবে না, আইনজীবীদের ঐক্য ধরে রাখতে, বিচার বিভাগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কী করতে হবে।

১৯৮৮ সাল থেকে মাহবুবে আলমের সঙ্গে আমার পরিচয়। ওই বছরের এপ্রিল থেকে তাঁর জুনিয়র হিসেবে আইন পেশায় কাজ শুরু করি। তখন সুপ্রিম কোর্টে যে কয়েকজন নামকরা সিভিল আইনজীবী, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। এই মাহবুবে আলম ছিলেন আইনাঙ্গনের আরেক দিকপাল প্রয়াত খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদেরই যোগ্য উত্তরসূরি। তিনি খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদের জুনিয়র ছিলেন। আর আমি মাহবুবে আলমের জুনিয়র। একটি মামলায় শুনানির জন্য নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করতে হবে তা শিখেছি তাঁর কাছ থেকে।

মাহবুবে আলম মারা গেলেন ৭১ বছর ছয় মাস বয়সে। কিন্তু এই বয়সেও একটি মামলায় নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করতে হয় তা অনেকের মাঝেই নেই। মাহবুবে আলম রাত জেগে বিভিন্ন রেফারেন্স দেখে নিজেকে তৈরি করতেন। আর এ কারণেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। যত জটিল মামলাই হোক না কেন তিনি সাবলিলভাবে মূল বিষয় অতি সংক্ষেপে তুলে ধরতে পারতেন। প্রতিপক্ষ তাঁকে যতই উত্তেজিত করার চেষ্টা করুক না কেন তিনি কোনো দিনই উত্তেজিত হতেন না। প্রতিপক্ষ বা বিচারপতিরা যত কঠিন কথা বলুন না কেন, হাসিমুখে উত্তর দিতেন তিনি। এটা পারতেন তাঁর জ্ঞানের গভীরতার কারণে। বিচারাঙ্গনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি দল-মত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতেন। সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতেন। এত ঠাণ্ডা মাথার আইনজীবী বা মানুষ মেলা ভার।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সদালাপী ও একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ। মাহবুবে আলম নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে গেছেন আইন পেশা ও আইনজীবীদের প্রতি দায়বদ্ধতা রক্ষার জন্য। তাঁর মতো আইনের পণ্ডিতকে হারালো দেশ।

আদালতে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে কারো সঙ্গে হয়তো তাঁর মনোমালিন্য হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তিনি কোনো দিন কোনো মানুষের সঙ্গে কটু কথা বলেননি বা কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। এই ইতিহাস তাঁর নেই। তাঁর একটি দরদি মন ছিল। অসহায় মানুষ যদি একবার মাহবুবে আলমের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন তবে তাকে খালি হাতে ফেরত দেননি। চেষ্টা করেছেন কিছু না কিছু করার। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও যদি কোনো জুনিয়র আইনজীবী তাঁকে বলেছেন, তাঁর পক্ষে মামলা করে দিয়েছেন, না করেননি। তবে একটি বিষয়, তিনি অন্যায় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গন থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করতে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। কোনো আদালতে দুর্নীতি হলে তিনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন; দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক না কেন তিনি তাকে ছেড়ে কথা বলেননি, তাকে ছাড় দেননি। এই ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি তাঁকে সবচেয়ে বেশি মিস করবে। তাঁর দুর্নীতিবিরোধী কাজ এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমাদের ওপর। আমরা তাঁর জুনিয়ররা তাঁর দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

আমি সৌভাগ্যবান এই কারণে যে তাঁর মতো একজন সিনিয়র পেয়েছিলাম। তিনি নিজে আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। আমি যখন তরুণ আইনজীবী তখন অনেক রাত তাঁর বাসায় থেকে গিয়েছি। এসব দিনে তিনি নিজ হাতে আমাকে খাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতো একজন সিনিয়র পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার।

 

লেখক : অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন, সিনিয়র আইনজীবী। সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা