kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

রংপুর নগরে বৃষ্টির পানি নামার পথ নেই

জলের সঙ্গেই লড়ছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলের সঙ্গেই লড়ছে মানুষ

শত বছরের রেকর্ড ভেঙে এক রাতের বৃষ্টির পানিতে এখনো ডুবে আছে রংপুর মহানগরের অর্ধশত পাড়া-মহল্লাসহ বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল। সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় কমেনি পানিবন্দি লাখো মানুষের ভোগান্তি। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট। গতকাল সোমবার দুপুরে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

এর আগে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা রংপুরের ইতিহাসে শতাব্দীর সর্বোচ্চ বৃষ্টি। নগরের প্রধান দুটি খাল একসময় আশীর্বাদ হলেও পানি বের হতে না পাড়ায় তা এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। নগরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্যামাসুন্দরী খাল ও কেডি ক্যানেল উপচে পড়ায় বৃষ্টির পানি বের হতে পারছে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার দ্বিতীয় দিনেও গতকাল রংপুর নগরের বেশির ভাগ এলাকা পানিবন্দি রয়েছে। নগরের মুলাটোল থানা মোড়, মুন্সিপাড়া, গোমস্তপাড়া, সেনপাড়া করণজাই রোড, খলিফাপাড়া, নগর মীরগঞ্জ, সর্দারপাড়া, বাবুখাঁসহ এখনো প্রায় ৫০টির মতো পাড়া-মহল্লায় বৃষ্টির পানি আটকে আছে। কিছু কিছু এলাকায় রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রিতষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে আছে। কয়েক হাজার পরিবার স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাবার বিতরণ করেছে।

রংপুরে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির পানিতে এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের বেশির ভাগ পুকুর ও খাল-বিল উপচে পড়েছে। এতে মাছ চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখনো পানিতে তলিয়ে আছে বিভিন্ন এলাকার শাক-সবজির ক্ষেতসহ ফসলি জমি। কোথাও কোথাও পানির তোড়ে রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রংপুর নগরের জলাবদ্ধতাসহ যেকোনো পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম শ্যামাসুন্দরী খাল এখনো পানিতে উপচে আছে। শ্যামাসুন্দরী পারের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখনো স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা কেউ তাদের খোঁজখবর নিতে আসেনি।

নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কানু শেখ জানান, গতকালও কোমর পানি ডিঙ্গিয়ে প্রধান সড়কে এসে শুকনো খাবার কিনেছেন। বৃষ্টির পানিতে ঘরে হাঁটুপানি থাকায় রান্না করার উপায় না পেয়ে পরিবার নিয়ে শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি খেয়ে দিনাতিপাত করেছেন। তিনি বলেন, শ্যামাসুন্দরী খালের পানি বের হওয়ার পথ না পাওয়ায় জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে আছি। নগরের বর্ধিত এলাকা ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ এখনো চরমে। এই তিন ওয়ার্ডের পাড়া-মহল্লাগুলো হাঁটু থেকে কোমর পানি পর্যন্ত তলিয়ে রয়েছে। বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে উঁচুস্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কয়েকটি বাজারে পানি প্রবেশ করায় দোকানপাট বন্ধ করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ওই সব ওয়ার্ডের মানুষজনের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

এদিকে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নগরীর বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মাঝে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরো শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আসিব আহসান। সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মাহাবুবার রহমান টিটু বলেন, ‘আমরা এখন পানিতে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে ব্যস্ত। বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মাঝে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে রংপুরের বদরগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে উপজেলার দুই হাজার ২৭০ হেক্টর জমির আমনের ক্ষেত এখন পানির নিচে। প্রায় সাত কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এ অবস্থায় অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষজন গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসামগ্রী চেয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।

গাইবান্ধায় করতোয়া, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘটসহ জেলার সব নদীর পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। অন্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপত্সীমা অতিক্রম না করলেও করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি পয়েন্টে গতকাল বিকেল ৩টায় বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাকছুদুর রহমান জানান, জেলার সাত উপজেলায় এক হাজার ৭৫০ হেক্টর জমির আমন ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ২৫ হেক্টর জমির শাক-সবজি পচে নষ্ট হয়েছে। কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল সকালে ধরলা নদীর পানে বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রেও পানি বাড়ছে। দেড় শতাধিক চর প্লাবিত হওয়ায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন করে ১৮ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। ভারি বৃষ্টির কারণে শত শত হেক্টর জমির বেগুন, মুলা, কপি, লাল শাকের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

এদিকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ছয় হাজার কৃষকের ৫৫০ হেক্টর আবাদি জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়। টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গতকাল পর্যন্ত ৫৫০ হেক্টর আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, ৭৪০ হেক্টর জমি আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে।

(প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা