kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবস আজ

তথ্য জানতে গেলে নাই

আজিজুল পারভেজ   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তথ্য জানতে গেলে নাই

তথ্য অধিকার আইন হওয়ার এক দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের খুব কম মানুষই জানে এ সম্পর্কে। ফলে এই আইন ব্যবহার করে তারা তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে পারছে না। সাম্প্রতিক তিনটি জরিপ অনুসারে দেশের ৮১.৭ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জানে না। আবার অনেকেই এই আইনের অধীনে তথ্য চেয়েও পাচ্ছেন না সরকারি-বেসরকারি অফিসের অবজ্ঞা-অনীহার কারণে।

এ প্রেক্ষাপটে আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী উদ্যাপিত হচ্ছে বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবস। বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘তথ্য অধিকার সংকটে হাতিয়ার’ এবং স্লোগান ‘সংকটকালে তথ্য পেলে জনগণের মুক্তি মেলে’ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে প্রতিপাদ্য ও স্লোগান যা-ই থাকুক, জানা গেছে, তথ্য পেতে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ হয় না। প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। বগুড়ায় কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক লিমন বাসার কাস্টম এক্সাইজ ভ্যাট বিভাগে কিছু তথ্য চেয়ে যথাযথ নিয়মে আবেদন করেন। কিন্তু তাঁকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। না দেওয়ার বিষয়টি জানানোও হয়নি। এরপর তিনি আপিল করেন। সেখান থেকেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। লিমন বাসার জানান, এরপর তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করা নিজের কাছে বিড়ম্বনা মনে হওয়ায় হাল ছেড়ে দেন।

কালের কণ্ঠ’র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের কিছু তথ্য চেয়ে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর যথাযথ নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় ক্ষেপণ করে। একপর্যায়ে ওই কোষাধ্যক্ষ অবসরে চলে যান। ফলে আবেদনকারীও এ ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ঢাকায় কর্মরত একজন সাংবাদিক জানান, একটি দপ্তরে তিন পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট চেয়ে আবেদন করেন। তাঁকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে তিন পৃষ্ঠার জন্য ছয় টাকা জমা দিতে বলা হয়। এই চালান জামা দিতে গিয়ে ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সারা দিনে কাজটি করতে না পেরে তিনি হাল ছেড়ে দেন।

দেশে তথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে ২০০৯ সালে। এই আইনের অধীনে দেশের যেকোনো নাগরিক যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে নির্দিষ্ট ফরমে তথ্য চাইলে ওই প্রতিষ্ঠান ২০ কর্মদিবসের মধ্যে তথ্য জানাতে বাধ্য। না জানালে আপিল করা যাবে। আপিল করেও তথ্য না পেলে তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ করলে কমিশন শুনানির মাধ্যমে দায়ী কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জরিমানা করতে পারে। এ কারণে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সরবরাহকারী কর্মকর্তা এবং আপিল কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তা ওয়েবসাইটে প্রচারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আইনটি সম্পর্কে মানুষ এখনো অবহিত নয়। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে অবহিত না হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে দেশের ৯২.৩ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জানে না। তরুণদের ওপর পরিচালিত এমআরডিআইয়ের অন্য এক জরিপ অনুসারে দেশের ৭৭.৮ শতাংশ তরুণ এই আইন সম্পর্কে জানে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপ অনুসারে ৭৫ শতাংশ মানুষ জানে না।

এমআরডিআই ও বিশ্বব্যাংকের জরিপে ৬৪ জেলার ৭৬৮ জন তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা, সমানসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি অফিসের প্রধান, ২১ জেলার ৩৫৯ জন তথ্যগ্রহীতা, তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা ৩৪০ ব্যক্তি এবং ১২ হাজার ৮০০ নাগরিক অংশ নেন। জরিপটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত হয়। জরিপে অংশ নেওয়া নাগরিকদের মধ্যে মাত্র ৭.৭ শতাংশ মানুষ আইনটি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে বলে জানান। তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাদের তিন ভাগের দুই ভাগ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো একটিও আবেদন পাননি গ্রহীতার কাছ থেকে। একইভাবে ৩৫৯ আবেদনকারীর মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগ জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁরা প্রত্যাশিত তথ্য পাননি।

তরুণদের তথ্য পাওয়ার সহজলভ্যতা নিয়ে এমআরডিআইয়ের পরিচালিত জরিপটি চলতি বছরে প্রকাশ করা হয়। আট বিভাগের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মোট ৭০৬ জন তরুণ এতে অংশ নেন। ২২.২ শতাংশ তরুণ জানান, তাঁরা আইনটি সম্পর্কে জানেন। ১৯ শতাংশ তরুণ তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে কষ্টকর মনে করেন। ১৪ শতাংশ মনে করেন, প্রক্রিয়াটি জটিল এবং ১১.৪০ শতাংশ তথ্য চাইতে গিয়ে লাঞ্ছিত হওয়া বা ঝুঁকির ভয় আছে বলে মনে করেন।

গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর ‘তথ্য অধিকার আইন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ : আইনের প্রথম দশকের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সভায় টিআইবি জানিয়েছিল, ২৫ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার সম্পর্কে জানলেও তাদের মধ্যে ২০ শতাংশের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। গত ১০ বছরে তথ্য পাওয়ার জন্য ৯৯ হাজার ২৩৮টি আবেদন জমা হয়। গড়ে বছরে ১১ হাজারের মতো আবেদন পড়ে, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় খুবই সামান্য।

তথ্য কমিশন সর্বশেষ ‘অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম’ চালু করেছে। এতে তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো তথ্য চেয়ে আবেদন করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই উদ্যোগটিরও বেহাল লক্ষ করা গেছে। গত বছরের ৬ মার্চ উদ্বোধন করার পর এতে সারা দেশ থেকে তিন হাজার ৫৯৬টি আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু জবাব দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬৬টি। প্রক্রিয়াধীন ৮২টি। আবেদন বাতিল করা হয়েছে ১৬টি। আবেদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তিন হাজার ৪৯৬টি। আপিল জমা পড়েছে ১৫টি।

 

মন্তব্য