kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘শায়েস্তা খাঁ আমল’

মসুর ৪২ ছোলার ডাল ৪৯

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মসুর ৪২ ছোলার ডাল ৪৯

পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি দেশি মসুর ডাল (ছোট দানা) ১০৫ থেকে ১১০ টাকা, খুচরায় যা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। আর মোটা দানা মসুর ডাল পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরায় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে পাইকারি বাজারে উন্নত মানের ছোলার ডাল প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭৩ টাকা। খুচরায় ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।

অথচ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের টেন্ডারে বন্দিদের জন্য উন্নত মানের মসুর ডাল (মোটা দানা) প্রতি কেজি ৪২ টাকা ৭০ পয়সা এবং উন্নত মানের ছোলার ডাল (খাঁটি) প্রতি কেজি ৪৯ টাকা ৩০ পয়সায় সরবরাহের জন্য দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে কারা অধিদপ্তরে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত কম দামে দেশের কোথাও উন্নত মানের মোটা দানার মসুর ডাল কিংবা উন্নত মানের ছোলার ডাল পাওয়া না গেলেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের টেন্ডারে সম্প্রতি সর্বনিম্ন দরদাতা দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হলো? সাড়ে ছয় হাজার বন্দির জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার ডাল কেনা হবে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের বিভিন্ন কারাগারে ডাল সরবরাহকারী কয়েকজন ঠিকাদার জানান, ওই দুই প্রতিষ্ঠান যদি কারা অধিদপ্তর থেকে কার্যাদেশ পায়, তাহলে বাজারদরের চেয়ে এত কম দামে ডাল সরবরাহ সম্ভব নয়। কেউ ব্যবসা করতে এসে লোকসান দিয়ে পণ্য সরবরাহ করবে না। হয়তো কম দামে ডালের টেন্ডার হাতিয়ে নিয়ে অন্যভাবে নয়ছয় করে লাভ করবে। হতে পারে কারাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে পরিমাণে কম সরবরাহ, কিংবা বন্দির সংখ্যা বেশি দেখিয়ে বাড়তি বিল করা হবে। বন্দিদের খাবারের নামে এভাবে সরকারের টাকা লুটপাটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. রফিকুল ইসলাম গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাল সরবরাহের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দুই দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য ডিআইজি প্রিজনের (চট্টগ্রাম) মাধ্যমে প্রস্তাব কারা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে কারাগারে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বন্দি রয়েছেন। কার্যাদেশ পেলে আমরা কার্যাদেশ মোতাবেক তাদের (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) কাছ থেকে উন্নত মানের ডাল বুঝে নেব।’

বাজারদরের চেয়ে এত কম দামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিভাবে ডাল সরবরাহ করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। আমি দুঃখিত।’

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আরেক সদস্য চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডা. ওয়াজেদ চৌধুরীও এ ব্যাপারে কথা বলতে অপারগতা জানান।  

গত ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মসুর ও ছোলার ডাল সরবরাহের টেন্ডার হয়। উন্নত মানের মসুর ডালের (মোটা দানা) দরপত্রে আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সোহেল ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটি মসুর ডাল প্রতি কেজির দর দিয়েছে ৪২ টাকা ৭০ পয়সা।

উন্নত মানের ছোলার ডাল সরবরাহের টেন্ডারে সাতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অজয় ব্রাদার্স। প্রতিষ্ঠানটি ছোলার ডাল প্রতি কেজি ৪৯ টাকা ৩০ পয়সা দর দিয়েছে। মূল্যায়ন কমিটি এ দুই ডালের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দুই দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিতে প্রস্তাব দেয়। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ডিআইজির (প্রিজন) মাধ্যমে এই প্রস্তাবনা ঢাকায় কারা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

নতুন টেন্ডারে যে প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পাবে, তাদের কাছ থেকে আগামী ১ অক্টোবর থেকে বন্দিদের জন্য ডাল সংগ্রহ শুরুর কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও কেন্দ্রীয় কারাগারে ডালের টেন্ডারের পর কার্যাদেশ দেওয়া হলেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কার্যাদেশ এখনো দেওয়া হয়নি।

ছোলার ডাল সরবরাহে সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স অজয় ব্রাদার্সের অজয় নন্দী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কার্যাদেশ পেলে ওরা (কারাগার কর্তৃপক্ষ) যেভাবে বলবে, সেভাবে ডাল সরবরাহ করব।’ এত কম দামে কিভাবে সরবরাহ করবেন, জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি মসুর ডাল (মোটা) ৪৭ টাকা কেজি এবং আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি ছোলার ডাল ৬২ টাকা দরে সরবরাহ করছে।

মন্তব্য