kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

বালু উত্তোলনে তোয়াক্কা নেই নিয়ম-নীতির

ভাঙন বেড়েছে, সেতু কালভার্ট ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাঙন বেড়েছে, সেতু কালভার্ট ঝুঁকিতে

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নদীগর্ভ থেকে এভাবে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শ্রীবরদী উপজেলার খাড়ামোড়া এলাকার সোমেশ্বরী নদীর দৃশ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

উচ্চ আদালত ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কড়া নির্দেশনার পরও থামছে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নদীগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে বালু। ফলে কোনো কোনো এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকিতে পড়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ নাব্যতা সংকট তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি জেলায়। নদীগর্ভের বালু তীরে ফেলায় নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমির উর্বরতা। প্রভাবশালী এই বালু কারবারিদের ভয়ে স্থানীয় লোকজন কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। অবৈধ এই কারবার বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনও নিচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও মৌলভীবাজার থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ—

ইটভাটার কারণে এমনিতেই প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে জমি হারাচ্ছে উর্বরতা। নদীগর্ভ থেকে বালু তোলা বন্ধ করতে ২০১৯ সালের ১৭ জুন জেলা প্রশাসকদের কাঠোর নির্দেশ দেন আদালত। প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে অভিযান চালাতেও বলা হয়। এরপর অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধে গত ৬ সেপ্টেম্বর ৬৪ জেলা প্রশাসক ও পাঁচ সচিবকে নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায়নি। অবশ্য চাঁদপুরসহ কয়েকটি জেলায় কিছুটা সুফল পাওয়া গেছে।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকিতে পড়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কাঁচপুর সেতু। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে অসাধু কারবারিরা। জাইকার অর্থায়নে নির্মিত কাঁচপুর দ্বিতীয় সেতুটি হুমকির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি বিআইডাব্লিউটিএর শুল্ক আদায়ের নামে বড় বড় জাহাজ নোঙর করে মালপত্র ওঠানো-নামানোর ফলেও সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। কাঁচপুর দ্বিতীয় সেতুর দক্ষিণ পাশে সরকারদলীয় নেতা পরিচয়ে বালু

তুলছেন আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। প্রশাসনের অনুমতি না নিয়েই তিনি বালু উত্তোলন করছেন। স্থানীয় লোকজন জানায়, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন আনোয়ার।

অভিযোগ সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি অনুমোদন নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছি।’ তবে বিআইডাব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা জানান, সেতুর আশপাশের এলাকায় বালু কারবারের জন্য কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। যারা এই বালু তোলার সঙ্গে জড়িত, তারা অবৈধভাবে এই কারবার করছে। দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিমরাইল এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার কাঁচপুর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করেছে। এক বছর না যেতেই বালু কারবারিদের উৎপাতে সেতুটি হুমকিতে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পিলারের মাটি সরে সেতুটি হুমকির মধ্যে পড়বে।’

প্রশাসনের অনুমোদন না নিয়েই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল, কালুরঘাট, চরণদ্বীপ, শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা অবাধে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছেন। প্রায় ২৩ কিলোমিটার নদীর তীরবর্তী এলাকায় ৩১টি পয়েন্টে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে হুমকিতে পড়ছে শতকোটি টাকার নদীভাঙন প্রকল্প, কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর কালিতলাঘাট কুলিক নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। ঘনশ্যামপুর কালীমন্দির এলাকায় প্রায় এক লাখ টাকার বালু উত্তোলন করে জমিয়ে রাখা হয়েছে। প্রভাবশালী ভাটা মালিক ও বালু কারবারি নুর নবী রাতের আঁধারে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নদী-নালা, খাল-বিল থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। এতে সংলগ্ন সড়ক, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে ভূমিধস। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের অন্তত ১০৭টি পয়েন্টে অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু।

চাঁদপুরে মেঘনায় আটটি বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছে জেলা প্রশাসন। ইজারা দেওয়া বন্ধ থাকায় দৃশ্যত বালু তুলছে না কেউ।

আইনের তোয়াক্কা না করে অসাধু কারবারিরা নির্বিচারে বালু তুলছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার খোয়াই নদ থেকে। বালু তোলার ফলে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন সেতু, কাছিরখিল সেতু, পাকুড়িয়া সেতু সংলগ্ন এলাকাসহ আমকান্দি এলাকায় আরো অনেক স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। খোয়াই নদের অন্তত ৪০টি পয়েন্টে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাইসহ বিভিন্ন নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। প্রভাবশালী বালু কারবারিচক্র রাত-দিন মিলে তুলছে বালু। এই প্রভাবশালীদের দাপটে অসহায় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তারা। ধলাই নদীতে প্রচুর স্বর্ণকণার মাটি থাকায় তা উত্তোলন করছে অসাধু কারবারিরা। এ ছাড়া উপজেলার লাঘাটা নদী, সুনছড়া, জবলাছড়া, লুঙ্গছড়া, পদ্মছড়া, লাউয়াছড়া থেকে প্রতিদিন তোলা হচ্ছে বালু।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলনের ধুম পড়েছে। বালু কারবারিরা মানছে না সরকারি নিয়ম-নীতি। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না বলে জানায় স্থানীয় লোকজন। আলফাডাঙ্গা পৌরসভার মিঠাপুর চরপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ফসলি জমি থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে চরপাড়া রাস্তার কাজে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী মহল। এ ছাড়া কুসুমদি গ্রামে দুটি ড্রেজার দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। অভিযোগ রয়েছে বালু কারবারি শাহ আলমসহ কয়েকজন অবাধে বালু উত্তোলন করছে ওই এলাকায়। এভাবে বালু উত্তোলন করায় এলাকার ফসলি জমি ধ্বংস হচ্ছে। বালু কারবারিদের ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি কেউ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বালু উত্তোলনের ফলে নদীর মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সরকারের কঠোর নির্দেশনার পরও বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা