kalerkantho

শনিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৮ সফর ১৪৪২

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ

অনিশ্চিত অপেক্ষা

মৃত্যু বেড়ে ৩১, চিকিৎসাধীন পাঁচজন

জহিরুল ইসলাম   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনিশ্চিত অপেক্ষা

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে দগ্ধ আব্দুস সাত্তার শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন। স্ত্রীর কান্না। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

দুপুর ২টা। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউয়ের সামনে অপেক্ষমাণ নজরুল ইসলামের (৫০) স্বজনরা। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন তিনি। নজরুলের স্ত্রী ও মেয়ে রোজিনা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের পাশে বসে আছেন মেয়েজামাই মুন্না। তিনি বলেন, ‘বুধবারে আব্বারে দেখে আসছি। তখন নড়াচড়া করেছে। মাথা নেড়ে কথার উত্তরও দিছে। আজকে এখনো দেখা করিনি। অপেক্ষায় আছি।’

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন সাতজনের স্বজনরা অপেক্ষা করছেন। আট দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দায় স্বজনের আরোগ্যের অপেক্ষায় তাঁরা। যে অপেক্ষা পরিণত হচ্ছে লাশের জন্য অপেক্ষায়। চিকিৎসকরাও রোগীর অবস্থার উন্নতির অপেক্ষায় থাকছেন।

জানা গেল, নজরুল সকালেই আগুনে পোড়ার যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এখন শুধু হাসপাতালের কার্যক্রম শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর অপেক্ষা।

নজরুলের মতো অগ্নিদগ্ধ শেখ ফরিদের মৃত্যুর খবরও জানত না তাঁর পরিবার। পরে হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাঁদের জানানো হয়। এর আগে ভোরে মারা যান আব্দুস সাত্তার।

এমন দুঃসংবাদের জন্য পরিবারগুলো অপেক্ষায় না থাকলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যুর সংবাদ শুনতে হলো।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া, শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে অগ্নিকাণ্ডের পর অতিরিক্ত ধোঁয়া। যার কারণে রোগীদের বাঁচানো যাচ্ছে না। বাকি যে পাঁচজন আইসিইউতে আছেন, তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক না হলেও খুব বেশি ভালো না। তবে আশা করছি ভালো কিছুর।’

দগ্ধ শেখ ফরিদ (২২) মাস্টাররোলে নারায়ণগঞ্জের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পাশাপাশি পশ্চিম তল্লায় একটি মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মা খোদেজা আক্তার সন্তানের জন্য নিঃশব্দে কান্না করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘পোলাটা কিশোরগঞ্জ আছিলো। সেইখানে ভালা আছিলো। পোলাটার লগে বেহানে (বৃহস্পতিবার) কথা হইছে, কইলো, আম্মা আমি ভালো হয়ে যাব। কান্না কইরেন না। আব্বা কেমন আছে? পোলাটা জানেও না তার লগের মানুষগুলা মইরা যাইতাছে!’

খোদেজা আক্তার যখন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন যন্ত্রণা গোপন করা শেখ ফরিদ মারা গেছেন। কিন্তু তখনও মা জানেন না।

চিকিৎসাধীন আমজাদের (৩০) অবস্থা আশঙ্কাজনক না হলেও সন্দিহান পরিবার। তাঁর বাবা আব্দুল আহাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যান চালাইন্না পোলাটা আমার কোন দিন নামাজ ছাড়ে নাই। সব সময় কইতো আব্বা কয়দিন বাঁচবা নামাজটা পড়। এমন পোলা আমার আগে এখন মওতের দিকে। বাঁচবো কি না জানি না। আশায় আশায় হাসপাতালে পইরা আছি।’

অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সী শিফাতের অপেক্ষায় তাঁর বাবা স্বপন মিয়া। শিফাত চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পছন্দের কলেজ দিয়ে পেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর কদমবুচি কলেজ। কিন্তু এখনো ভর্তি হওয়া হয়নি। বাবার আশা ছেলে সুস্থ হবে, ভর্তি হবে।

স্বপন মিয়া বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণিতে পড়া থেকেই ছেলেটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত।’

আরেক অগ্নিদগ্ধ মো. কেনান কাজ করতেন পোশাক কারখানায়। ঘটনার পর মা-বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর ছোট ভাই ইমরান বলছিলেন, ‘পশ্চিম তল্লায় ওই মসজিদের পাশে পরিবার নিয়ে থাকতাম। করোনার সময় আব্বা-আম্মাসহ সবাই গ্রামে চলে যায়। আমি আর ভাই থাকতেছিলাম। সেদিন দুপুরে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হইছিলো। আর কথা হয়নি।’

চিকিৎসাধীন আরেকজন আজিজ (৪০)। মসজিদের পাশে লন্ড্রি দোকান ছিল তাঁর। সব সময় আজানের সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতেন মসজিদে। সেদিনও ব্যতিক্রম হয়নি। গতকাল ড্রেসিং করার পর শরীরের যন্ত্রণা কিছু বাড়লেও খাওয়ানো হয় তাঁকে।

দগ্ধ আরেকজন ফরিদ (৪৫)। তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার স্বামীর সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায়। তাঁর দুই ছেলে আর দুই মেয়েরও অপেক্ষা বাবা কখন সুস্থ হবে। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল হলেও বড় মেয়ে খাদিজা অসুস্থ হওয়ায় এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জ। মেয়ের বাসার পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পর এমন কিছু ঘটবে চিন্তাতেই ছিল না কারো। কিন্তু ঘটে গেল।

দগ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করছে বলে জানা গেছে। এ কারণে এমন ঘোর বিপদের মধ্যেও পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তিতে আছে। তবে প্রিয়জনের ঝলসে যাওয়া মুখ দেখে ঘুম আসে না কারো।

গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে এশার নামাজের সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম তল্লায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৩৭ জন দগ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে একজন সুস্থ হলেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত মারা গেছেন ৩১ জন। পাঁচজন এখনো চিকিৎসাধীন।

চিকিৎসাধীন পাঁচজন আগের চেয়ে ভালো আছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও তাঁদের স্বজনরা। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ সংকর পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোগীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হচ্ছে না। সব সরকারি খরচে চলছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা