kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

ভাঙনের ক্ষত জনপদে

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী বললেন কয়েক বছরের মধ্যে দেশের কোথাও নদীভাঙন থাকবে না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভাঙনের ক্ষত জনপদে

বন্যার পানি কমতে শুরু করায় নদীভাঙন ভয়ংকর চেহারায় ফিরেছে। বন্যার দুর্ভোগ শেষ হতে না হতেই ভাঙন দেখা দেওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে নদীপারের মানুষ। অনেক এলাকায় ভাঙনের গতি এত বেশি যে কেউ কেউ তাদের বাড়িঘর সরানোর সময়ও পাচ্ছে না। এদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম গতকাল মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে বলেছেন, ‘শুধু বর্ষা এলেই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙন রক্ষার চেষ্টা নয়, এখন থেকে বর্ষার আগেই সব ভাঙনপ্রবণ এলাকায় আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেব। ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কোথাও আর নদীভাঙন থাকবে না।’ এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

মুন্সীগঞ্জ : পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীবিধৌত মুন্সীগঞ্জে আরো ভয়াবহ রূপে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে লৌহজংয়ের শিমুলিয়ার দুটি ফেরিঘাট। পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি আর বাড়িঘর। মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে গজারিয়ার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি আর ঘর। ধলেশ্বরীর ভাঙনে শহর রক্ষা বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় হুমকির মুখে রয়েছে মুন্সীগঞ্জ শহর। এ ছাড়া সিরাজদিখানেও ধলেশ্বরীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে মানুষের বসতবাড়ি। বছরের পর বছর এসব এলাকা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভাঙন রোধে কার্যত তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ভাঙন শুরু হলে কিছু বালুর বস্তা ফেলেই দায়িত্ব শেষ করে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করায় এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এবার ধলেশ্বরী নদীতে পানি বেড়ে স্রোতের তীব্রতায় মুন্সীগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের মালিরপাথর এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাঁধের বিশাল এলাকা ধলেশ্বরীতে বিলীন হয়ে গেছে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাঙন থেকে রক্ষায় নির্মিত শহর রক্ষা বাঁধটি কয়েক বছর ধরে সংস্কার না করায় শহরের হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, নয়াগাঁও, মিরেশ্বর, বাগবাড়ী, মুক্তারপুর সেতু এলাকা, মালিরপাথর ও বিনোদপুর পর্যন্ত একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী টি এম রাশিদুল কবীর জানান, করোনার কারণে শহর রক্ষা বাঁধটির সংস্কারকাজ পিছিয়ে যায়। বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ব্লক তৈরি করা হয়েছে। ধলেশ্বরীর পানি কমলে সংস্কারের কাজ শুরু হবে।

এদিকে পদ্মার ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়িতে। গত ২৮ জুলাই শিমুলিয়া ৩ নম্বর রো রো ফেরি ঘাটটি বিলীন হয়ে যায়। এর তিন দিন পর ফেরি ঘাটসংলগ্ন পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ভাঙনে সেতুর রেলওয়ে ও রোডওয়ে স্ল্যাবসহ ১০০ টনের বেশি লোহার পাত নদীগর্ভে চলে যায়। এখনো হুমকির মুখে আছে ইয়ার্ডটি। এর কয়েক দিন পর আবারও ভাঙন দেখা দেয় শিমুলিয়া ঘাটে। গজারিয়ায় শেঘনার ভাঙনে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে হাজারো পরিবার।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলের যমুনা, ধলেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। বিশেষ করে যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীতে ভাঙনের মাত্রা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, ভাঙনকবলিতদের পুনর্বাসন করা হবে। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, নাগরপুর ও কালিহাতীর নদীর পার ভাঙছে বেশি। বাড়িঘর, গাছপালার সঙ্গে ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। হারিয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া, হুগড়া, মাহমুদনগর, কাতুলী, ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা, অর্জুনা, নাগরপুরের মাহমুদনগর, সলিমাবাদ, কালিহাতীর গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়নের  বিভিন্ন এলাকায় এবার ভাঙন দেখা দিয়েছে। মির্জাপুর, গোপালপুর ও বাসাইলেও পানি আরো কমার পর ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে স্থানীয়দের শঙ্কা। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকাকে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ে ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে বেড়েছে করতোয়ার ভাঙন। ফলে ধুঁকছে পঞ্চগড়ের বোদার বেংহাড়ি বনগ্রাম ইউনিয়নের সোনাচান্দি, সরকারপাড়া, বন্দরমনি, নিচার ঘাট, আরাজি শিকারপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। ওই এলাকায় প্রধান রাস্তাটির বেশির ভাগই এখন করতোয়ায় বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়, মসজিদ ও ফসলি জমিসহ সহস্রাধিক ঘরবাড়ি রয়েছে ঝুঁকিতে। গত বছর নামমাত্র জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও কাজে অনিয়ম হওয়ায় তা কোনো কাজেই আসেনি। এবার ভাঙন আরো বেড়েছে। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা ভাঙনের স্থানগুলো চিহ্নিত করে বাঁধের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছি। প্রকল্প পাস হলেই সে অনুযায়ী বাঁধের ওই স্থানে কাজ হবে।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হয়েছে তিস্তার ভাঙন। এক দিনেই ওই গ্রামের শেষ বাড়িঘরগুলো ভেঙে নদীগর্ভে চলে গেছে। গত এক সপ্তাহে তিস্তার ভাঙনে প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি ও শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যায়। ভাঙন দেখা দিয়েছে উপজেলার হরিপুর, শ্রীপুর, চণ্ডিপুর, বেলকা ও কাপাসিয়া ইউনিয়নে। এসব এলাকায় গত তিন দিনে ভাঙনের শিকার হয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। অন্যদিকে তীব্র ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরগঞ্জ-উলিপুর সওজের আঞ্চলিক সংযোগ সড়ক।

কুড়িগ্রাম : বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিকল্প বাঁধটির ৪০০ মিটার অংশ বিলীন হয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে সারডোব গ্রামবাসী। এখন ঘূর্ণিস্রোতের দাপটে ভাঙছে পার। ভাঙনের আতঙ্ক গ্রামজুড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাঁহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, সারডোবের ভাঙন প্রতিরোধে আপাতত বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। পানি নেমে গেলে ৮০০ মিটার অংশ স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষার কাজ করা হবে।

শরীয়তপুর : পদ্মারপারসহ জেলার ১৫ স্থানে থেমে থেমে চলছে নদীভাঙন। গত দুই মাসে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে নড়িয়ার চরআত্রা ইউনিয়নের ৮১ নম্বর বসাকেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবন। ধসে পড়েছে সুরেশ্বর দরবার শরিফ রক্ষা বাঁধের ৫৫ মিটার।  বিলীন হয়েছে ৮ শতাধিক বসতবাড়ি ও বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা