kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৭ । ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৪ সফর ১৪৪২

পিংক সিটিতে ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব

গত অর্থবছরে প্রায় ২৪১ কোটি টাকা ফাঁকি

ফারজানা লাবনী   

১১ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পিংক সিটিতে ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশান-২-এর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পিংক সিটি শপিং মল। এ শপিং মলে দুই শতাধিক দোকান ভ্যাট দিতে সক্ষম হলেও মাত্র ৬৪টি দোকান ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা মূল্য সংযোজন কর) নিবন্ধন নম্বর গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৪০টি প্রতিষ্ঠান সঠিক হিসাবে ভ্যাট পরিশোধ করলেও অন্যরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাওনা ভ্যাটের অতি সামান্য পরিশোধ করেছে। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) এই শপিং মলে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২৪১ কোটি টাকা।

সম্প্রতি ভ্যাট নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে পিংক সিটির ভ্যাট ফাঁকির এসব তথ্য জানা যায়।

বারবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও পিংক সিটির বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করেনি। পরে ওই শপিং মলে ভ্যাট ফাঁকির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এরপর এসংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয় এনবিআরে।

এ বিষয়ে ভ্যাট নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পিংক সিটির মতো এত বড় এবং চালু একটি শপিং মলে ভ্যাট ফাঁকির এ চিত্র অপ্রত্যাশিত। এ শপিং মলের ভ্যাট পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখতে গিয়ে ভ্যাট গোয়েন্দারা বিস্মিত হয়েছেন। এখানে মাত্র ৬৪টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করেছে। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ তিনি আরো বলেন, ভ্যাট গোয়েন্দারা তদন্ত করে দেখেছেন পিংক সিটিতে এমন অনেক দোকানও আছে, যেখানে বছরে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধের কথা। অথচ দিচ্ছে মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও এখানকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট পরিশোধ তো দূরের কথা, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি।

চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) শুরু থেকেই রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনে নজরদারি বাড়িয়েছে এনবিআর। সংস্থার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট নিরীক্ষা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ দুই দপ্তরে এনবিআরের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলি করে আনা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনায় এই তিন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর সর্বশেষ বাজেট বক্তব্যে বলেছিলেন, সারা দেশে প্রায় ৫০ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদানে সক্ষম হলেও বেশির ভাগ এনবিআরের নজরদারির বাইরে রয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, সারা দেশের সাত লাখ ৫০ হাজার প্রতিষ্ঠান পুরনো পদ্ধতিতে ভ্যাট নিবন্ধন নিলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করেছে মাত্র ৩২ হাজার। গত অর্থবছরে ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়ন করায় সারা দেশে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ পর্যন্ত অনলাইনে এক লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন গ্রহণ করেছে। ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে এনবিআর প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে ইএফডি (ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস) যন্ত্র দেবে। কোনো বিক্রয়কেন্দ্র অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর গ্রহণ করলেই শুধু আধুনিক এ যন্ত্রের মাধ্যমে এনবিআর স্বচ্ছতার সঙ্গে ভ্যাট আদায় করতে পারবে। তা না হলে ওই প্রতিষ্ঠান এনবিআরের নজরদারির বাইরেই থেকে যাবে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই এনবিআর থেকে নোটিশ জারি করে বলা হয়েছে, ভ্যাট প্রদানে সক্ষম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূূলক অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানের দর্শনীয় স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। পুরনো ভ্যাট নিবন্ধন বাতিল করা হবে। অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আইন অনুসারে জরিমানা করা হবে। জরিমানার পরিমাণ অভিযান পরিচালনাকারী রাজস্ব কর্মকর্তা নির্ধারণ করবেন। তবে জরিমানার অঙ্ক যে পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হবে তার থেকে কম হবে না।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর এক লাখ তিন হাজার কোটি টাকা, ভ্যাট এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক ৫৭ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক ৩৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক ৫৫ হাজার কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক তিন হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা ও অন্যান্য কর এক হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর বকেয়া আদায়ে এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে জোর দিয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা