kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ কার্তিক ১৪২৭। ২৯ অক্টোবর ২০২০। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সরেজমিন গাইবান্ধা

‘বন্যাত ডুবি ফির ভাঙনে সর্বহারা হই’

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘বন্যাত ডুবি ফির ভাঙনে সর্বহারা হই’

গাইবান্ধা সদরের কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট গ্রাম। সেই গ্রামের অমূল্য চন্দ্র সাহা, প্রতাপ ঠাকুর আর সুমন কুমারদের দুঃখের কাহিনি যেন শেষ হচ্ছেই না। একই গ্রামের দুলু মিয়া, হায়দার আলী আর শাহীনুর বেগমও কথা বলতে শুরু করে শেষ করতে পারেন না। কষ্টের কান্নায় বাক্রুদ্ধ হয়ে যান তাঁরা। বানের পানি কমতে শুরু করার পরপরই গত এক সপ্তাহে ওই এলাকার কমপক্ষে ৩৫ পরিবার তাদের ঘরদোর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। কেউ কেউ সামান্য জিনিসপত্র সরাতে পারলেও বেশির ভাগ পরিবারই তা পারেনি। তাদের আশ্রয় হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্থানীয় অন্নময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কামারজানি মার্চেন্টহ  উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে।

এই প্রতিবেদককে কাছে পেয়ে শাহীনুর বেগম বললেন, ‘এর আগোত তিন দফা জমিজিরাত, বাড়িঘর হারাচি। হামার মতো এই এলাকার অনেকে কয়েক মাস আগে অল্প করিয়্যা জমি কিনিয়্যা ঘর বানাচে। ব্রহ্মপুত্র তামানে খালো। আল্লাহর কী লীল্যা বাহে, এখন দিনমজুরি আর মানষের বাড়িত কাম করিয়্যা খাওয়া ছাড়া হামার কোনো গতি নাই।’ প্রতাপ ঠাকুর বলেন, ‘কী ভাগ্য নিয়্যা জন্ম নিছি। বন্যাত ডুবি, ফির ভাঙ্গনে সর্বহারা হই। এদিক হাতোত ট্যাকা নাই। কাইয়ো সাহায্য নিয়্যা আসেও না। কবার পান হামাঘরের কী হবে?’

স্থানীয় বাসিন্দা আসিফ আহমেদ জানান, বন্যার আগে থেকেই গাইবান্ধার কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাট এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় গোঘাট গ্রাম ও এর আশপাশের এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। গত এক মাসে ভাঙনের কবলে পড়ে ঐতিহ্যবাহী পুরনো দুর্গামন্দিরসহ ৫০টি বসতবাড়ি ও এর সংলগ্ন জমি এবং গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া স্লুইস গেট, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র, কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, কামারজানি বন্দর, মার্চেন্ট হাই স্কুলসহ ৫০০ পরিবারের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি এখন হুমকির মুখে।

একই পরিস্থিতি সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের পোড়ার চরের শিরিনা বেগম, সালাম মিয়া, আফজাল মিয়াদেরও। বন্যা ও নদীভাঙনে সব হারিয়ে এখন তাঁরা আছেন বোচাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সালাম মিয়া বললেন, ‘ঢাকায় রিকশা চালিয়া পরিবার চলাতাম। করোনাত বাড়ি আসিয়্যা আর যাবার পাই নাই। আলো বন্যা। বাড়ি তো গেলই, গরু-ছাগল সগ্যে শ্যাষ। এখন এক বেলা কোনো রকম প্যাট ভরাই। কী করমো ভাবি পাইন্যা।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য রেজাউল মিয়া জানান, তিনি নিজেই ১২ বার ভাঙনে পড়েছেন। এই লোকগুলোরও একই অবস্থা। ঘরবাড়ি সংস্কার, খাদ্য সহায়তা আর কর্মসংস্থান না হলে মাথা তুলে দাঁড়ানো মুশকিল হবে। শুধু পোড়ার চর নয়, সুন্দরগঞ্জের শ্রীপুর, হরিপুর এলাকার ভাঙন পরিস্থিতিও খুব খারাপ।   

জনপ্রতিনিধিরা জানান, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ির বিভিন্ন এলাকায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও বাঙ্গালী নদীর স্রোতের তীব্রতা বেড়ে ভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার পরিবার ভাঙনকবলিত হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যায় সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি এখনো চূড়ান্তভাবে নিরূপণ করা যায়নি। তবে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।  ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে।

মন্তব্য