kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

লৌহজংয়ে পদ্মার থাবা

তৈমুর ফারুক তুষার, ঢাকা ও মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



লৌহজংয়ে পদ্মার থাবা

ভাঙন : পদ্মার দ্বিতীয় দফা ভাঙনে বিলীন লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ভিআইপি ফেরিঘাট। ছবিটি গতকালের। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রমত্তা পদ্মার করাল গ্রাসে হুমকির মুখে রয়েছে ঢাকার অদূরে ঐতিহ্যবাহী মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা। সম্প্রতি এখানকার ১২টি ইউনিয়নের কয়েক শ ঘরবাড়ি, ফেরিঘাটসহ নানা স্থাপনা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করলে ভাঙন আরো তীব্র আকার ধারণ করবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়দের মতে, ভাঙন থেকে লৌহজংকে রক্ষায় প্রয়োজন স্থায়ী বাঁধ। এ বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে রয়েছে। আর এর কারণে নিজেদের কয়েক পুরুষের পুরনো ভিটামাটি হারিয়ে মূল্য দিচ্ছে লৌহজংয়ের মানুষ।

এদিকে লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট এলাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ৪ নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাট। ফেরিঘাটের অ্যাপ্রোচ সড়কসহ পার্কিং ইয়ার্ডের বেশ কিছু জায়গাও নদীগর্ভে চলে গেছে। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে এ নৌ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। সীমিত পরিসরে চলছে সিবোট ও ফেরি। উত্তাল পদ্মার ঢেউ আর প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তে হুমকির মুখে রয়েছে ২ নম্বর ফেরিঘাটও। এ ঘাট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ফেরি চলাচল।

বিআইডাব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শিমুলিয়া ঘাটে ভাঙন দেখা দিলে ৪ নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাটটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙন এখন ২ নম্বর ফেরিঘাটের কাছে রয়েছে। এ ঘাট দিয়েও ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ১ নম্বর ফেরিঘাট চালু থাকলেও এটিও প্রায় অচল। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পরে এ ঘাট থেকে একটি-দুইটি ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। তবে যেকোনো সময় এই ১ নম্বর ঘাটও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে লৌহজংয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মেদিনীমণ্ডল, কুমারভোগ, হলদিয়া, কনকসার, লৌহজং কেউটিয়া, গাওদিয়া, কলমাসহ আরো কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সর্বস্বান্ত মানুষ বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান জীবন যাপন করছে। কুমারভোগ ইউনিয়নের শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ৩ নম্বর ফেরিঘাটের খানিক অংশ ভেঙে পদ্মায় হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এ ঘাটটির কার্যক্রম বন্ধ আছে।

কনকসারের সিংহেরহাটি এলাকায় দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে টিনের চালা ও বেড়াগুলো স্তূপ করে রেখে ছোট ছাপরা (একচালা টিনের ঘর) তৈরি করে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে অনেক পরিবার। একটি চৌকিতে গাদাগাদি করে পরিবারের সদস্যরা ঘুমাচ্ছে, আর পাশেই থাকছে তাদের পালিত পশুগুলো।

রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া দুদু মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে এখানে কষ্টে আছি। ভাড়ায় জায়গা খুঁজছি বাড়ি করার জন্য। আমাদের পুরো চরই নদীতে চলে গেছে। যে যেদিকে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ হলদিয়া জামে মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহের খানিকটা অংশ এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঈদগাহের বাকি অংশও হুমকির মুখে। এখানে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বালির বস্তা ফেলা হয়েছে।

এখানকার বাসিন্দা স্বপন সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব বস্তা ফেলে কিছু হয় না। বস্তা ফেলায় প্রচুর দুর্নীতি হয়। এখানে দরকার স্থায়ী বাঁধ। যাতে বছর বছর নদীভাঙনে মানুষকে সর্বস্বান্ত হতে না হয়।’

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাবিরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে জানান, কয়েক দিনে নদীভাঙনে ১০৭টি পরিবার গৃহহীন হয়ে অন্যের জায়গায় ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছে।

পদ্মা সেতুর কাজে সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী জানান, ঈদের আগের দিন রাত ২টা থেকে পদ্মা সেতুর কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ভাঙন দেখা দেয়। এ সময় নদীসংলগ্ন ইয়ার্ডের ভেতরে রাখা ১২৫টি রোডওয়ে স্ল্যাব নদীগর্ভে চলে গেছে, যা আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া এক শ টনের ওপরে স্টিলের পাত বা লোহার পাইপ চলে গেছে পদ্মার গর্ভে। এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও রেলওয়ে স্ল্যাব নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হবে। ১৯২টি রেলওয়ে গার্ডার চলে গেছে নদীগর্ভে। ১৯২টি গার্ডার, যা প্রায় ছয়টি স্প্যানের সমান। এসব রেলওয়ে গার্ডার লুক্সেমবার্গ থেকে আনা হয়েছিল, যা অন্য কোনো দেশ তৈরি করতে পারে না। তবে গার্ডারগুলো পদ্মার গর্ভ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি আরো জানান, পদ্মা এখন ঠিক একটি ওয়ার্কশপের পাশের দেয়ালঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ওয়ার্কশপ ভেঙে গেলে পদ্মা সেতুর কাজের কোনো সমস্যা হবে না। কারণ ওয়ার্কশপে যেসব কাজ হতো তা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তবে ওয়ার্কশপের ভেতরে তিনটি দামি ইকুইপমেন্ট রয়েছে। ভাঙন আপাতত বন্ধ হয়েছে। তবে আবারও ভাঙন দেখা দিলে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড টিকিয়ে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।

স্থানীয়দের মতে, পদ্মা সেতুর লৌহজংয় প্রান্তে মাত্র তিন কিলোমিটারের মতো নদীশাসনের কাজ রাখায় এই এলাকায় ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। পদ্মা সেতুর অপর পার অর্থাৎ জাজিরা অংশে প্রায় ১২ কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ চলছে। সে তুলনায় লৌহজংয়ে নদীশাসনের আওতা খুবই কম।

পদ্মা সেতুসংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী কালের কণ্ঠকে জানান, বিগত এক শ বছরে পদ্মার পানি প্রবাহের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে নদীশাসনের কাজটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পদ্মা তার গতিপথ কিছুটা পরিবর্তন করায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতুসহ লৌহজং এলাকার ১২টি ইউনিয়নকে রক্ষায় একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি প্রায় চার বছর আগে থেকে পানিসম্পদসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ে ২০টিরও অধিক ডিও লেটার দিয়েছেন। একপর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু এ প্রকল্পটি কয়েক বছর ধরেই মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। ফলে এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে না।

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৯০ সালের দিকে ভাঙন শুরু হয়। কিন্তু বিএনপি আমলে কোনো কাজ হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বেশ কিছু কাজ হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বন্যায়ই জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ হয়। এতে তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু উপকার হয়। এখন আমরা চাইছি লৌহজং রক্ষায় স্থায়ী কাজ করতে। এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে কয়েক দফায় ডিও দিয়েছি। এরই মধ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। আমরা আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই স্বপ্নের পদ্মা সেতু সংলগ্ন লৌহজংকে রক্ষায় এ প্রকল্প অনুমোদন দেবেন।’

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী টি এম রাশিদুল কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, এ এলাকায় স্থায়ী বাঁধের জন্য গত জানুয়ারি মাসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৬৪৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাঠানো হয়। কিন্তু প্রকল্পটি রিভিউ করে ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য ফাইলটি আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়। বর্তমানে এটি নতুন করে ডিজাইন করে ব্যয় কমিয়ে আনার কাজ চলছে। এখন বাঁধের দৈর্ঘ্য কমিয়ে ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার রাখা হয়েছে। যার প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১৪ কোটি টাকা। খুব দ্রুতই এ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

স্থায়ী প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীভাঙন এলাকাগুলোয় আমরা করোনার মধ্যেও জরুরি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন নদীভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করার। আমরা কয়েক বছরের মধ্যেই সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করব। লৌহজংয়ে স্থায়ী বাঁধের প্রকল্পটি নিয়েও কাজ চলছে। এটি অনুমোদনের পর একনেকে পাঠানো হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা