kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

পল্লবী থানার ভেতর বিস্ফোরণ

সন্ত্রাসীরা জঙ্গিদের ভাড়া করা?

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সন্ত্রাসীরা জঙ্গিদের ভাড়া করা?

জঙ্গি হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশ তার সব ইউনিটকে সতর্ক করার পর পল্লবী থানার ভেতর বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে যে বক্তব্য দিয়েছে তার বাইরে কোনো রহস্য আছে কি না সে বিষয়টি সামনে আসছে। পুলিশ বলছে, আগের রাতে গ্রেপ্তার করা তিন সন্ত্রাসী একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিসংগঠন ইসলামিক স্টেট এ হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ দাবি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এ ঘটনায় জঙ্গিদের জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, জঙ্গিরাও এদের ভাড়া করে থাকতে পারে। সে জন্য ঘটনাটি অনেক কিছু বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করতে হবে।

গত বুধবার সকাল ৭টার দিকে পল্লবী থানার ভেতরে দুটি বিস্ফোরণে চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। ওজন মাপার একটি ডিজিটাল মেশিনের ভেতরে বিস্ফোরক রাখা ছিল। যন্ত্রটি পরীক্ষার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর ওই যন্ত্র থেকে একটি বোমাও উদ্ধার করা হয়, যা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের আদলে তৈরি।

পুলিশের ভাষ্য, গত মঙ্গলবার রাতে মিরপুরের কালশী থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করা তিন সন্ত্রাসীর কাছ থেকে ওই ওজন মাপার যন্ত্রটি জব্দ করা হয়। কিন্তু তাঁদের কবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে যে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজনের পরিবার বলেছে, বিস্ফোরণের ঘটনার দুই দিন আগে তাঁদের তুলে আনা হয়েছে।

বিস্ফোরণের ঘটনায় ওই তিন সন্ত্রাসীসহ পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামি হলেন রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁদের আদালতে হাজির করে অস্ত্র মামলায় সাত দিন এবং বিস্ফোরক মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মইনুল ইসলাম দুই মামলায় তিনজনের ১৪ দিন করে রিমান্ড আদেশ দেন।

এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহতদের মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ব্লকের আবাসিক সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা সবাই এখন অনেকটাই শঙ্কামুক্ত।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সূত্র জানায়, আদালত থেকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে এনে তিন আসামিকে পৃথক তিনটি কক্ষে নিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন আসামিকে রিমান্ডে এনে ঘটনার সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সারা দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার মধ্যেই পল্লবী থানায় এভাবে বিস্ফোরণের ঘটনায় অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এ নিয়ে যতক্ষণ না ধোঁয়াশা কাটছে ততক্ষণ এর নেপথ্যের সত্যটা পুলিশকেই তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।

এর নেপথ্যের মদদদাতা কারা, ওজন মাপার যন্ত্রের ভেতর কেন এবং কী উদ্দেশ্যে বোমা রাখা হয়েছিল, নাকি ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে জঙ্গিরা পুলিশকেই টার্গেট করেছিল, এই হামলার মাধ্যমে জঙ্গিরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে কি না—এমন অনেক প্রশ্ন রেখেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার। গতকাল বিকেলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অপরাধীরা থানার ভেতরে এ ঘটনা ঘটাতে পারে না। পুলিশ যতই বলুক, তারা একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওজন মাপার যন্ত্রের মধ্যে এভাবে অভিনব কায়দায় বোমা রেখেছিল, তা মেনে নেওয়া কঠিন। জঙ্গিরাও তাদের ভাড়া করতে পারে। কারণ করোনাভাইরাসের এই সময়েও অনেক জঙ্গি ধরা পড়ছে। যাদের মুখে দাড়ি নেই। সাধারণ সন্ত্রাসীদের মতো তারা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো বেশি কৌশলী হওয়ার পরামর্শ তাঁর।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, থানায় এ ধরনের বোমা বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ অপরাধীদের কাজ নয়। কারণ একটি ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রে বোমা লুকিয়ে মাস্তানরা ব্যবহার করবে, এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কৌশল পরিবর্তন করতে জঙ্গিরা এদের ভাড়া করে থাকতে পারে। যেহেতু আক্রমণের ধরনটা অভিনব। আবার পুলিশের পক্ষ থেকেও কয়েক দিন ধরে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে, আইএস এরই মধ্যে দায় স্বীকার করেছে। সব মিলিয়ে এটা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি না করে বরং রাষ্ট্রের স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া উচিত।

এর আগে ভিন্ন ধরনের বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারককে উদ্দেশ্য করে বইবোমা ছুড়ে মারা বা টিফিন ক্যারিয়ারে করে বোমা ছুড়ে মারার ঘটনায় সরাসরি জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা ছিল। ওজন মাপার যন্ত্রের ভেতরে রাখা বোমাগুলো আইইডির আদলে তৈরি। জঙ্গিরা সাধারণত এ ধরনের আইইডি তৈরি করে। তা ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর ঈদুল আজহার সময় জঙ্গি হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক অবস্থান নিতে গত ১৯ জুলাই সারা দেশে পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানকে চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সকাল ৬-৮টা বা সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে হামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৫-৩০ বছর বয়সী কেউ হয়তো নাশকতার পরিকল্পনা করছে। পল্লবী থানার আসামিদের বয়সও এর সঙ্গে মিলে যায়।

ওই চিঠি পাঠানোর পাঁচ দিনের মাথায় গত শুক্রবারও রাজধানীর পল্টন এলাকায় পুলিশের একটি চেকপোস্টের পাশে ‘আইইডি’ বিস্ফোরিত হয়। এর আগে গত বছর রাজধানীর পাঁচটি স্থানে, খুলনা ও চট্টগ্রামে পুলিশকে টার্গেট করে আইইডি নিক্ষেপ এবং পুলিশ ভ্যানে আইইডি বিস্ফোরিত হয়েছিল।

যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, পল্লবীর এই বিস্ফোরণের সঙ্গে এখন পর্যন্ত জঙ্গি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। আইএসের দায় স্বীকার নিছকই ‘ক্রেডিট নেওয়া’ বলে দাবি করেন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া তিন সন্ত্রাসীও জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের লোক বলে স্বীকার করেছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইএস অতীতেও অনেক ফেক ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। এবারও সে রকমই দেখা যাচ্ছে। আমরা এখন পর্যন্ত এ ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাইনি। এর পরও আইএস যেহেতু দায় স্বীকার করেছে, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’

 

মন্তব্য