kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

অনেক মানুষের ঈদ এবার আশ্রয়কেন্দ্রে

► বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫১ লাখ মানুষ
► উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব নদীর পানি ফের বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অনেক মানুষের ঈদ এবার আশ্রয়কেন্দ্রে

বন্যা : বন্যার পানিতে রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের আরো এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। মুগদার দক্ষিণ মাণ্ডার কদমতলী এলাকা থেকে গতকাল তোলা। ছবি : মীর ফরিদ

বানের পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে আছে। নিরুপায় হয়ে বন্যাদুর্গতরা উঠেছে আশ্রয়কেন্দ্রে। দুঃসংবাদ হলো—কমপক্ষে ৬৬ হাজার মানুষের এবারের কোরবানির ঈদ কাটবে ওই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে। গত ২৭ জুন থেকে শুরু হওয়া বন্যায় পানিতে ভাসছে ৩১ জেলা। এসব জেলার এক হাজার ৫৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৬ হাজার মানুষ উঠেছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পুরুষ রয়েছে ২৭ হাজার, নারী ২৪ হাজার, শিশু ১৩ হাজার। বাকিরা প্রতিবন্ধী। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আবারও জানিয়েছে, আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের  আগে বানের পানি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ২৮ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য তিন কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে এখন বন্যাকবলিত উপজেলা ১৫০টি। পানিবন্দি পরিবার ১০ লাখ ৫৮ হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত ৫১ লাখ মানুষ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, রাজধানীর নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই। আজ শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোর অবস্থাও একই। ঢাকার চারপাশে নদ-নদীর পানি কমার সম্ভাবনা খুব কম। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ছাড়া অন্য সব নদ-নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বাড়বে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে বাড়ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় এ অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরো বাড়বে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানিও কমছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় এসব নদীর পানিও কমবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি স্টেশনের মধ্যে পানি বেড়েছে ৪১টির, কমেছে ৫৭টির। অপরিবর্তিত রয়েছে তিনটি স্টেশনের। এখনো বিপত্সীমার ওপরে প্রবাহিত নদীর সংখ্যা ১৮টি।

এদিকে রাজধানী ঢাকার নিম্নাঞ্চল ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পানিবন্দি দুই হাজার পরিবারের ঈদ ম্লান করে দিয়েছে বন্যা। আর দুই দিন পর ঈদ হলেও এসব পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই। অনেকের ঘরে চুলা নেই। কেউ কেউ কোরবানিতে বিক্রি করার জন্য গরু পালন করেছিলেন। গরুর বাজার মন্দার খবরে অনেকে হতাশ। অনেকের ঘরের ভেতর পানি। সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নয়ামাটি, দেইলপাড়া, মালিরটেক, পিরুলিয়া, ছনেরটেক, চানখালী, দক্ষিণপাড়া, বসুলিয়া, রাতালদিয়া, রাজধানী ঢাকার ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইদারকান্দি, দক্ষিণ ফকিরখালী, বালুরপাড়া, বাবুরজায়গা, দাসেরকান্দি, গৌড়নগর, নাসিরাবাদ, শেখেরজায়গাসহ আরো বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দারা বেঁচে থাকার জন্য বানের পানির সঙ্গে লড়ছে। বানের পানিতে এক রকম দিশাহারা মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মানুষ। শুধু নিম্নাঞ্চলই নয়, পানি ঢুকেছে উঁচু জায়গার বসতবাড়িতেও। কারো বাড়ির আঙিনায় থইথই করছে পানি, আবার কারো ঘরের ভেতরেই কোমরপানি। সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। এরই মধ্যে ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে দেড় শতাধিক পরিবার। গতকাল মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের বিল বসুন্ধরা গ্রামটি ঘুরে দেখা যায় বন্যার ভয়াবহ চিত্র। চারদিকে পানি আর পানি। তলিয়ে গেছে নলকূপ। তাই বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে বিল বসুন্ধরাসহ বন্যাদুর্গত সব এলাকায়। বিশুদ্ধ পানির জন্য এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটছে অনেকেই। নৌকা না থাকায় কলাগাছের ভেলা বানিয়ে পানির খোঁজে ছুটছে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। বিল বসুন্ধরার মাওয়া মাহমুদপট্টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ভেতরেও এখন বুকপানি। বানের পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় অনেকেই মাচা বানিয়ে থাকছে। জানা গেছে, জেলার ১৫০টি গ্রাম বন্যার পানিতে ভাসছে। এর মধ্যে লৌহজংয়ের ৪৬, টঙ্গিবাড়ীর ৩৫, শ্রীনগরের ১৬, সিরাজদিখানের ১৪, সদর উপজেলার ২২ ও গজারিয়ার ১২টি গ্রাম রয়েছে।

গোপালগঞ্জের তিন উপজেলার সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গোপালগঞ্জ সদরের তিনটি, কাশিয়ানীর দুটি ও মুকসুদপুরের একটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। রাস্তাঘাটও তলিয়ে গেছে।

এদিকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শরীয়তপুরের নড়িয়ার চরআত্রা ইউনিয়নের ৮১ নম্বর বসাকেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন কাম সাইক্লোন সেন্টারটি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভবনটির সিড়ি ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। যেকোনো সময় পুরো ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর আগে গত বুধবার এই বিদ্যালয়ের একতলা ভবনটি পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকার অর্ধশতাধিক বসতবাড়িসহ অনেক ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।  শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবিব বলেন, পদ্মার ভাঙন রক্ষায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে চরআত্রা রক্ষা প্রকল্পের কাজ গত মার্চ থেকে চলছে। শুধু বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য ওই স্থানে ৭৪ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

টানা বর্ষণ ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ার ফলে শেরপুরের শ্রীবরদীতে ফসলি জমিসহ প্রায় অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে বন্যায় ডুবে গেছে রোপা আমন ধানের ক্ষেত, আমন ধানের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের খামার।

এদিকে নীলফামারীতে ফের বাড়ছে তিস্তার পানি। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত বুধবার বিকেলে সেখানে নদীর পানি বিপত্সীমার ২৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পানিবন্দি থাকা সিরাজগঞ্জের সাড়ে তিন লাখ মানুষের মধ্যে এবার কোরবানির ঈদের আনন্দ নেই। দুর্গত এসব মানুষ হাঁস-মুরগি আর গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু বাঁধ কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

গাইবান্ধায় সব নদীর পানি কমছে। ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানি অব্যাহতভাবে কমলেও এখনো তা বিপত্সীমার অনেক ওপর দিয়ে বইছে।  এরই মধ্যে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বেশির ভাগ গ্রামের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী করতে কিছুটা সময় লাগবে। অবশ্য কোনো কোনো চরের বন্যার্ত মানুষ, যারা বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল, এত দিনে তাদের কেউ কেউ ঘরে ফিরছে। এদিকে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে নদীভাঙন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা)

মন্তব্য