kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

সচিন, জ্যোতিরাদিত্যের বিদায়

আরো একা হয়ে পড়ছেন রাহুল গান্ধী

তামান্না মিনহাজ   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আরো একা হয়ে পড়ছেন রাহুল গান্ধী

ভারতের রাজনীতি রাহুল গান্ধীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আরো আগেই। এখন তাঁর অবস্থান অনেকটা সেই বিষণ্ন রাজকুমারের মতো, যিনি শতচেষ্টা, শ্রম, সময়, পরীক্ষা আর গবেষণার পরও রাজ্যপাটে মন বসাতে পারেননি। প্রজারা তো ছেড়ে গেছেই, এখন শুরু হয়েছে সহযোগীদের প্রস্থানের পালা। অন্তত সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এ সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে। সর্বশেষ রাহুলকে ছেড়ে গেলেন রাজস্থানের কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলট। এর আগে গত মার্চে একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মধ্য প্রদেশের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। রাহুলের এই দুই মেধাবী বন্ধুর কংগ্রেসত্যাগ বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে, কারণ পারিবারিকভাবেও গান্ধী পরিবারের  সঙ্গে এই দুই নেতার পরিবারের বিশেষ সখ্য ছিল।

তবে শুধু বন্ধুত্ব বা পারিবারিক সখ্য নয়, আরো বহু ক্ষেত্রেই পাইলটের সঙ্গে সিন্ধিয়ার সাদৃশ্য রয়েছে। রাজস্থানের উপপ্রধানমন্ত্রী পাইলটের (৪২) কংগ্রেস ছাড়ার কাহিনির শেষ অঙ্কের অভিনয় শুরু হয় ১০ দিন আগে। তিনি রাজ্যের রাজধানী জয়পুর থেকে দিল্লিতে উড়াল দেন। গত রবিবার জানান, দল ছাড়তে চান তিনি। মঙ্গলবার রাজ্য সরকার ভাঙার চেষ্টার অভিযোগ এনে কংগ্রেস তাঁকে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং রাজ্যের দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়।

ত্বরিত এ সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের মধ্যেই নানা ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। দলের কেন্দ্রীয় বহু জ্যেষ্ঠ নেতাই অভিযোগ করেন, পাইলটের বক্তব্য দলের শীর্ষ পর্যায় (গান্ধী পরিবার) থেকে শোনা হয়নি। অথচ পাইলটের রাজনীতিতে আসার পেছনে এ পরিবারের ভূমিকা কম নয়। পাইলটের বাবা ভারতীয় বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার রাজেশ পাইলট ছিলেন রাহুলের বাবা এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর খুব কাছের বন্ধু। মূলত রাজীবের অনুরোধেই পাইলটের পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন রাজেশ। অন্তত তিন দফা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হন তিনি।

সচিনের রাজনীতিতে আগ্রহ বাবাকে দেখে হলেও হাতেখড়ি মূলত রাহুল গান্ধীর কাছ থেকে। ২০০৭ সাল থেকে রাহুল আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতি শুরু করেন। সচিন প্রায় সেই সময় থেকে রাহুলের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজ্যের লোকসভা নির্বাচনেও জান লড়িয়ে কাজ করে গেছেন তিনি। কেন্দ্রের বহু নেতাই নির্দ্বিধায় এ কথা স্বীকার করেন, শচিনের মেধা ও শ্রমের কারণেই গেরুয়া ঝড়ের এ সময়েও রাজ্যে কংগ্রেস জয় পায়। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে তাঁকে পরবর্তী সময় মূল্যায়ন করেনি রাজ্য কংগ্রেস। অভিযোগ রয়েছে, উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ দেওয়া হলেও কাজ করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প তাঁর হাতে ছিল না। আমলাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, তাঁর কাছে যেন কোনো ফাইল না যায়। সব মিলিয়েই তাঁর বিস্ফোরণ ঘটে।

এমন বিস্ফোরণ এর আগে গত মার্চেও দেখা গেছে। এবারের তুলনায় সেবারের ঘটনাক্রমে পরিবর্তন মাত্র এটুকুই, কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন মধ্য প্রদেশের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া (৪৯)। এই জ্যোতিরাদিত্যের বাবা মাধব রাও সিন্ধিয়া তাঁর অঞ্চলের সর্বশেষ রাজা। ভারতে সাংবিধানিকভাবে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর তিনি রাজনীতি শুরু করেন স্থানীয় দলের হাত ধরে। পরে রাজীব গান্ধীর প্রভাবে তাঁর দলে যোগ দেন। জীবনে ৯টি নির্বাচন করেছেন, কখনো পরাজিত হননি। এমনকি অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধেও তিনি সফল হন। পাঁচ দফা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। রাহুলের সঙ্গে জ্যোতিরাদিত্যের শুধু পারিবারিক সম্পর্কই ছিল না, তাঁরা কলেজেও একসঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। রাজনীতিও একসঙ্গেই। ২০১৮ সালের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বেই লড়াই করে কংগ্রেস। সাফল্যও আসে। কিন্তু এই নেতার অভিযোগ, দল কখনোই তাঁকে মূল্যায়ন করেনি। বরং চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। ফলে ২২ এমএলএকে সঙ্গে নিয়ে দল থেকে বের হয়ে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। বিজেপি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মধ্য প্রদেশে সরকার গঠন করে।

রাহুল রাজনীতির গোড়ার দিকে যখন পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছিলেন, তখন এসব তরুণ নেতাই ছিলেন তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। তাঁদের ওপর নির্ভর করেই নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলেন রাহুল। বিষয়টি সুনজরে দেখেননি দলের প্রবীণ সদস্যরা। গত বছর অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর রাজনীতির মূল মঞ্চ থেকে সরে যান রাহুল। দলে সামনের দিকে চলে আসেন প্রবীণ নেতারা। তরুণরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। রাজ্যগুলোর অবস্থা হয় আরো ভয়াবহ। নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রাজ্যের নেতাদের হাতে। কেন্দ্র গুরুত্ব হারায়।

নেতৃত্ব ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলের প্রতিও রাহুলের মনোযোগ কমে যায়। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় যেসব তরুণ নেতা গড়ে উঠেছিলেন, তাঁরা ‘বাস্তুচ্যুত’ হন। শুধু এই দুই নেতাই নন, অন্ধ্র প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডিও কংগ্রেস থেকে বের হয়ে গিয়ে নতুন দল গড়তে বাধ্য হন।

রাহুল গান্ধী ব্যক্তি মানুষ হিসেবেই নীরবতাপ্রিয়, একটু যেন একাকিত্বই তাঁর পছন্দ। খোলসে মোড়া মানুষ। সম্ভব হলেই নিজ গণ্ডির মধ্যে ঢুকে যান। তাঁর এই প্রবণতাই ভারতের গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসকে আরো একঘরে, আরো জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে। জানা গেছে, এই দুই নেতাসহ আরো অনেকেই দল ছাড়ার আগে রাহুলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে গেছেন মাসের পর মাস। কিন্তু রাহুল তাঁদের সঙ্গে কথা বলেননি। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার মতো করেই টুইট করেছেন; যেখানে সদ্য ‘পর’ হয়ে যাওয়া এসব ‘আপন মানুষকে’ কাছে টানার আগ্রহ বা আকুতি—কোনোটিই প্রকাশ পায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা