kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

পদ্মা যমুনা ব্রহ্মপুত্র আত্রাই ভয়ংকর চেহারায়

ঘরে ঘরে বানের জল

► আটকা কয়েক লাখ মানুষ
► দেওয়ানগঞ্জের সঙ্গে জামালপুরের রেল যোগাযোগ বন্ধ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ঘরে ঘরে বানের জল

রেলপথে পানি : যমুনার পানিতে ডুবে গেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশন। ফলে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ রয়েছে দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর রেল যোগাযোগ। ছবিটি গতকালের। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে থইথই করছে বানের পানি। সেখানকার নিচু এলাকার প্রতিটি ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও আত্রাই নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। ধরলায় কিছুটা কমলেও দ্রুত বাড়ছে ব্রহ্মপুত্রের পানি। তিস্তা ও সুরমার পানি বিপত্সীমার নিচে নেমেছে। তবে পানি কমতে থাকায় বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এদিকে রেলস্টেশন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় দেওয়ানগঞ্জের সঙ্গে জামালপুরের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। বন্যাদুর্গতরা বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটে পড়েছে। অনেক এলাকায় খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। তবে পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাব রয়েছে। এদিকে বানের স্রোতে ভেসে গেছে মাছ, তলিয়েছে ক্ষেতের ফসল। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজার হাজার চাষি। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ধরলার পানি কিছুটা কমলেও দ্রুত বাড়ছে ব্রহ্মপুত্রের পানি। গতকাল বুধবার বিকেলে ধরলার পানি বিপত্সীমার ৮৮ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলার ৬০ ইউনিয়নের ৫২৫ গ্রাম প্লাবিত হয়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে রাজীবপুর উপজেলা পরিষদসহ পুরো উপজেলা শহর। গতকাল সকালে চিলমারীর মাছাবন্ধা গ্রামে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে রাকু মিয়া নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

জেলার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামের রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বেশির ভাগ এলাকা। স্রোতের টানে অনেকের ঘরবাড়ি ও মালপত্র ভেসে যাচ্ছে। উঁচু রাস্তা, বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে ৫০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। ফলে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীতীরবর্তী গাইবান্ধার চারটি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের দেড় লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তারা ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে পানির চাপ অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ভাষারপাড়া ও মাঝিপাড়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং সদর উপজেলার তালতলার বিপরীতে দক্ষিণ ঘাগোয়া এলাকায় ঘাঘট নদীর পানির চাপে কোমরনই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।

সিরাজগঞ্জ : যমুনার পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপত্সীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় যমুনায় পানি বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলার প্রায় ৫১টি ইউনিয়নের ২৫০ গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠতে শুরু করেছে। পানিবন্দি হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে পৌনে দুই লাখ মানুষ। তলিয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। গবাদি পশু নিয় বেশি বিপাকে পড়েছে বন্যাদুর্গত মানুষ।

কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) : যমুনার চরাঞ্চলের কাজিপুরের ছয়টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কাজিপুর পয়েন্টে যমুনার পানি ৩৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৯৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে নিশ্চিন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, ২০টি কমিউনিটি ক্লিনিক, আমিনা মনসুর মা ও শিশু কল্যাণ হাসপাতালসহ চরাঞ্চলের কাঁচা-পাকা রাস্তা।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় দেওয়ানগঞ্জের সঙ্গে জামালপুরের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে বন্যার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপত্সীমার ১২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : উলিপুরে দ্বিতীয় দফা বন্যার পানি বাড়তে থাকায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদী অববাহিকার আট ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানির তোড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, পুকুর-জলাশয়, বীজতলা ও রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ধুনট (বগুড়া) : ধুনটে যমুনা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। পানি বেড়ে গতকাল বিকাল ৩টায় বিপত্সীমার ১১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীভাঙন। পানির প্রবল চাপে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুইয়ে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। পানি চুয়ানোর স্থানগুলোতে বালুভর্তি বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চলছে। বাঁধটির যেকোনো পয়েন্টে ভেঙে গেলে যমুনার প্লাবনে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, বগুড়ার ধুনট, সারিয়াকান্দি, গাবতলী, সোনাতলা, শেরপুর উপজেলাসহ বগুড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হতে পারে।

মান্দা (নওগাঁ) : মান্দায় গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে আত্রাই নদীর পানি। এ নদীর পানি জোতবাজার পয়েন্টে এখন বিপত্সীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আত্রাই ও ফকির্ণী নদীর উভয় তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কমপক্ষে ৫০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে এ দুই নদীর উভয় তীরের সাতটি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই সহস্রাধিক মানুষ। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ মূল বাঁধে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।

নাটোর : আত্রাই ও গুরনই নদীর পানির তীব্র স্রোতে গতকাল ভোরে নাটোরের সিংড়ার শেরকোল ইউনিয়নের শাহবাজপুর-তাজপুর-তেমুখ সড়কের তিন স্থানে ভেঙে কয়েকটি গ্রামে হু হু করে পানি ঢুকছে। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি বাড়ি। গতকাল দুপুর পর্যন্ত আত্রাই নদীর পানি সিংড়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

আত্রাই-রাণীনগর (নওগাঁ) : নওগাঁর ছোট যমুনা ও আত্রাই নদীর সাহেবগঞ্জ অংশের পানি বিপত্সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ : পদ্মা-যমুনাসহ মানিকগঞ্জের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে পানি বাড়ছেই। এরই মধ্যে জেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ডুবে আছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট। পাানিবন্দি হয়ে পড়েছে নিম্নাঞ্চলের পাঁচ শতাধিক পরিবার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) ফারুক আহম্মেদ জানান, গতকাল দুপুরে শিবালয়ের আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিন সেন্টিমিটার হারে পানি বাড়ছে। ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গাসহ অভ্যন্তরীণ নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম না করলেও দ্রুত বাড়ছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দে পদ্মায় পানি বেড়ে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকালে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদ্মার গোয়ালন্দ পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উপজেলার নদীতীরবর্তী চারটি ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সেখানে বন্যা দেখা দিয়েছে।

জামালপুর : জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে যমুনার পানি বিপত্সীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বন্যায় সাত উপজেলার ৩৪২ গ্রামের সাড়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্যার কারণে দেওয়ানগঞ্জ-সানন্দবাড়ি-রাজিবপুর পাকা রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মাদারগঞ্জে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে গ্রামে গ্রামে। বন্যার পানিতে ডুবে জেলার মাদারগঞ্জে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : যমুনার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের চরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে কয়েকটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত যোকার চর পয়েন্টে যমুনার পানি বিপত্সীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কমছে। সুরমা, যাদুকাটা, চলতিসহ সীমান্ত নদ-নদীর পানিও কমছে। জেলার প্রধান নদী সুরমার পানি এখন বিপত্সীমার চার সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণ বন্ধ থাকায় পানি কমছে। সুরমাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও এখন বিপত্সীমার নিচে আছে। হাওরাঞ্চলেও পানি কমছে।

রংপুর : তিস্তার চরাঞ্চলের পরিবারগুলো কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে নদীর পানি কমতে শুরু করলেও বিভিন্ন এলাকায় বন্যার ক্ষত রয়ে গেছে। এর ওপর তিস্তার ভাঙন শুরু হওয়ায় চরবাসীর উৎকণ্ঠা কাটছে না।

মেহেরপুর : কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পানিতে মেহেরপুরের কয়েক হাজার বিঘা ফসলের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা