kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

উত্তরে পানির তোড়

ভয়ংকর হচ্ছে পদ্মা, সিলেট অঞ্চলে কিছুটা উন্নতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উত্তরে পানির তোড়

ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। এর ফলে গাইবান্ধার গজারিয়া থেকে ভরতখালী উল্লা বাজার পর্যন্ত সড়ক পানিতে থইথই করছে। ছবিটি গতকালের। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তর জনপদ থেকে বানের পানি নামছেই না। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা ও ঘাঘটের পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। নীলফামারী ও লালমনিরহাট পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ বিপৎসীমার নিচে নেমে এলেও এখনো পানিবন্দি অনেক মানুষ। বৃষ্টি কম হওয়ায় সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে সুরমা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে পদ্মা নদীতে দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড স্রোত। সেখানে ফেরি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আজ বুধবারের মধ্যে নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও রংপুরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও রাজবাড়ীর বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় এখনো লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। বন্যাদুর্গতরা বিশুদ্ধ পানি, খাবার, গোখাদ্য ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সংকটে রয়েছে। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাব রয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকেলে সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপৎসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে ৫৬টি ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক গ্রামের আনুমানিক তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী মহাসড়কের চণ্ডিপুর এলাকার তিন স্থানে পানি উঠেছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও পানি বাড়তে থাকায় যেকোনো মুহূর্তে এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বানভাসি মানুষের মাঝে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। উঁচু রাস্তা, বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। এদিকে নাগেশ্বরীর বল্লভেরখাস ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ গ্রামে গতকাল বিকেলে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো আলমগীর হোসেনের মেয়ে লামিয়া খাতুন (২) ও ব্রহ্মতর গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের মেয়ে মিমি খাতুন (৭)। 

গাইবান্ধা : সব নদ-নদীর পানি বেড়ে গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফলে নদীর তীরবর্তী গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটার ২৬ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের ৩০ হাজার ৮৭৬ পরিবারের দেড় লাখ  মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদের পানি শহরের নতুন ব্রিজ এলাকায় বিপৎসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি ক্রমেই বাড়ছে। এদিকে তিস্তার পানি কমছে। গতকাল বিকেলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, গত বছরের মতো এবারও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নদ-নদীতে পানি বাড়ার ফলে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিস আলী বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার জন্য ৩২০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ লাখ টাকা, চার লাখ টাকার শিশুখাদ্য, দুই লাখ টাকার গোখাদ্য ও তিন হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : সুন্দরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। তিস্তার পানি সাত সেন্টিমিটার কমলেও ব্রহ্মপুত্রের পানি তিন সেন্টিমিটার বেড়েছে। আর ঘাঘট নদের পানি বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকালে তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে সাত সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আর ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে আট ইউনিয়নের ১০ হাজার ৮৩০ পরিবারের ৪৩ হাজার মানুষ।

নীলফামারী : ‘উন্মত্ত’ তিস্তার গর্জন থেমেছে। সব রেকর্ড ভেঙে পানিপ্রবাহের পর গতকাল বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার নিচে নামে। এতে তিস্তাপারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি গতকাল সকাল ৬টায় বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার, ৯টায় ২৫ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ১৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সিরাজগঞ্জ : গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বেড়ে গতকাল সন্ধ্যা থেকে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এদিকে যমুনায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। 

কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) : কাজীপুরের যমুনার চরাঞ্চলে অবস্থিত ছয়টি ইউনিয়নের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় কাজীপুর পয়েন্টে যমুনার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ধুনট (বগুড়া) : বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিন সেন্টিমিটার যমুনার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জামালপুর : জামালপুরে বন্যার আরো অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ১১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চার উপজেলায় পানি ঢুকে পড়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যায় জেলার সাত উপজেলায় প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

শেরপুর : ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলার ৯ ইউনিয়নের ২০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে কৃষকের সবজির আবাদ ও আমন বীজতলা তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে নালিতাবাড়ীর ফকিরপাড়া এলাকায় ভোগাই নদের ৩০০ মিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে মরিচপুরান ইউনিয়নে ৮০ হেক্টর এবং যোগানীয়া ও কলসপাড় ইউনিয়নে ১২০ হেক্টর জমির ফসল ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। মরিচপুরান ইউনিয়নে সদ্যোনির্মিত এক কিলোমিটার পাকা সড়ক ও পাঁচ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢলের পানিতে শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

সিলেট : দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে সিলেট নগরের একাধিক এলাকার কয়েক হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা কমলেও এখনো কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগামী শনিবার থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হতে পারে। ফলে ফের বন্যার পানি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

সুনামগঞ্জ : পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকায় সুরমা নদীর পানি কমছে। তবে এখনো ৯ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, নদীতে পানি কমলেও হাওরাঞ্চলে এই পানির চাপ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ : পাহাড়ি ঢলের কারণে পদ্মা নদীতে প্রচণ্ড স্রোত দেখা দিয়েছে। ফলে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলাচলে অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে। ফলে প্রতিদিনই উভয় পারে আটকে পড়া যানবাহনের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। গতকাল দুপুরে পারাপারের অপেক্ষায় ছিল পাঁচ শতাধিক যানবাহন।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দে পদ্মার পানি বেড়ে ফের বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গোয়ালন্দ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নদীর তীরবর্তী অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে আছে ওই সব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা