kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের জরিপ

করোনায় ৯৮.৬% পরিবারে জীবিকায় আঘাত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় ৯৮.৬% পরিবারে জীবিকায় আঘাত

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস এলোমেলো করে দিয়েছে মানুষের জীবন-জীবিকা। একদিকে মৃত্যুভয়, অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা। সরকার ঘোষিত টানা দুই মাসের সাধারণ ছুটিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা মাথায় নিয়ে জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হতে হয়েছে এই মানুষগুলোকে। যাদের দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯ ডলার বা ১৬৫ টাকার নিচে, সাধারণ ছুটির সময় এই দরিদ্র মানুষগুলো অর্থনৈতিকভাবে কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নিরূপণ করতে দেশের আটটি বিভাগের ৩৭টি জেলায় জরিপ চালিয়েছে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন।

তাদের পরিচালিত জরিপে উঠে এসেছে, কারো আয় কমে গেছে, কারো কমেছে বিক্রি। কেউ বা হারিয়েছেন চাকরি। করোনার প্রভাবে এই দরিদ্র মানুষজন বর্তমানে তিন বেলা খেতে পায় না। আবার পরিবারের আয় কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে খাদ্যাভ্যাসে। আগের মতো পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছে না খেটে খাওয়া এই মানুষগুলো। যেসব পরিবারে গর্ভবতী নারী আছেন, যেসব পরিবারে সন্তান মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল, যেসব পরিবারে সন্তান বাড়ন্ত, এর সব খানে আর্থিক অনটনে পুষ্টিকর খাবারের সংকট তৈরি হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৮.৬ শতাংশ বলেছে, করোনা তাদের জীবিকার ওপর কোনো না কোনোভাবে আঘাত হেনেছে; ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৯ শতাংশ বলেছে, করোনায় তাদের আয় কমে গেছে। ১৬ শতাংশ বলেছে, তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ১৫ শতাংশ বলেছে, করোনার প্রভাবে তাদের পরিবারে মারাত্মক খাদ্য সংকট তৈরি করেছে। ১৪ শতাংশ বলেছে, তাদের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

জরিপে উঠে এসেছে, করোনায় সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে সিলেট বিভাগে। আর সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। জরিপে অংশ নেওয়া বড় একটি অংশ বলেছে, করোনার কারণে তাদের পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে।

খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের জরিপটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। জরিপের ফলাফল আগামী ১৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। গত ১৫ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দৈব চয়নের ভিত্তিতে ৮৩৪ জনের ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এদের সবাই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে রিকশা ও ভ্যানচালক, হকার, গৃহকর্মী, গাড়িচালক, ছোট উদ্যোক্তা, কৃষি শ্রমিক এবং অনানুষ্ঠানিক কাজে কর্মরত মানুষ। গ্রামের ৪৩২ জন ও শহরের ৪০২ জন যাদের বয়স ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে এমন মানুষদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

জরিপটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনায় সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে দরিদ্র মানুষজন। পরিবারে আয় কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্যাভ্যাসে। পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছেন না গর্ভবতী মায়েরা। ফলে আগামী দিনে দেশে পুষ্টিহীনতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯৮.৯ শতাংশ পরিবার বলেছে, করোনার কারণে তাদের তিন বেলা খাবার সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনার আগে তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে পারলেও বর্তমানে তিন বেলা খাবার জোগাড় করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ এক বেলা, কেউ দুই বেলা খাবার খেয়ে দিন পার করছে। দেশের সব বিভাগেই দরিদ্র মানুষ বিপুলভাবে খাবারের সংকটে রয়েছে। সরকারের ত্রাণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কথাও জানান অনেকে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ শতাংশ বলেছে, করোনার কারণে তাদের পরিবারে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। ৪৫ শতাংশ তাদের পরিবারে অপুষ্টির খাবার বা পুষ্টিহীনতার কথা উল্লেখ করেছে। ৭৪ শতাংশ বলেছে, তারা আগে তিন বেলা খাবার খেত আর বর্তমানে খাচ্ছে দুই বেলা। ৫ শতাংশ বলেছে, তারা বর্তমানে এক বেলা খাবার খাচ্ছে। আর ২১ শতাংশ বলেছে, তারা তিন বেলা খাবার পাচ্ছে।

বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জরিপটি মূলত করা হয়েছে করোনার কারণে দরিদ্র শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে। এতে দেখা গেছে, করোনা দরিদ্র মানুষের জীবিকার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। আর পরিবারে মারাত্মক খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। ৯০ শতাংশের ওপর উত্তরদাতা বলেছে, করোনার প্রভাবে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম খেতে পায় না তারা। চাল, ডাল, আলু দিয়ে পার করছে দিন।’ তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষগুলো করোনার আগে তিন বেলা খেতে পারত। কিন্তু বর্তমানে তিন বেলা খেতে পায় না। যা খাচ্ছে, সেটাও পুষ্টিকর নয়।

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের টিলা ও বনভূমি বেষ্টিত গ্রাম নকশির বাসিন্দা দিপালী রংপা। ৫০ বছর বয়সী রংপার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস দিনমজুরি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর সরকারের নির্দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। ফলে চার সদস্যের এই পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ ছুটির কারণে আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো মতে তারা দুই বেলা খাবার গ্রহণ করছে। অনটনে পড়ে তারা মাঝে মাঝে পাহাড়ি জংলী আলুও খাচ্ছে।

বরিশালে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে বাস করেন সালমা বেগম। স্বামীর ফলের ব্যবসায় যে আয় হতো তা দিয়ে খেয়ে-পরে ভালোই ছিলেন। করোনার কারণে স্বামীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। আর্থিক অনটনে পড়ে তিন বেলার পরিবর্তে বর্তমানে দুই বেলা খাবার গ্রহণ করছেন তাঁরা। পুষ্টিকর খাবারও খেতে পারছেন না তাঁরা।

জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ গর্ভবতী ও সদ্য মা হওয়া নারীরা বলেছেন, এ সময়ে তাঁদের বাড়তি যে খাবার পাওয়ার কথা, তাঁরা তা পাচ্ছেন না। ৯ শতাংশ বলেছে, তারা যথেষ্ট খাবার পাচ্ছে। দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের বাড়তি খাবার দিতে পারছে না ৭২ শতাংশ পরিবার। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৩৪ জনের মধ্যে ৫১ শতাংশ বলেছে, করোনায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার সময় সরকারের পক্ষ থেকে নগদ টাকা, ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার কথা শুনলেও তারা পায়নি। ৪৯ শতাংশ বলেছে, তারা সরকারের সহযোগিতা পেয়েছে। ৮৭ শতাংশ পরিবার বলেছে, সরকারি ও বেসরকারিভাবে যেসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা