kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

রেকর্ডভাঙা পানিপ্রবাহ, ৯ ঘণ্টা ছিল ‘রেড অ্যালার্ট’

এমন ‘উন্মত্ত’ তিস্তা আগে দেখেনি কেউ

► উত্তরে বানের জলে বন্দি মানুষ
► সিলেট অঞ্চলেও প্লাবিত নিম্নাঞ্চল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এমন ‘উন্মত্ত’ তিস্তা আগে দেখেনি কেউ

হু হু করে বাড়ছে পানি। তলিয়ে গেছে সুনামগঞ্জের অনেক অঞ্চল। গতকাল শহরতলির নতুনপাড়া এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সব রেকর্ড ছাপিয়ে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল ‘আগ্রাসী’ তিস্তার পানি। এমন ‘উন্মত্ত’ চেহারার তিস্তাকে আগে দেখেনি কেউ। গত রবিবার মধ্যরাতে তিস্তার পানিপ্রবাহ সর্বকালের রেকর্ড ভাঙে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ওই রাতের ঘুম রীতিমতো হারাম করে ছাড়ে তিস্তা। উপায় না দেখে তিস্তা ব্যারাজসহ আশপাশের এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। পরে গতকাল সকাল ৯টার দিকে তিস্তার ঢল কিছুটা থিতু হলে তুলে নেওয়া হয় ‘রেড অ্যালার্ট’।

এদিকে যমুনা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, ধরলা ও সুরমার পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। ফলে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল এখনো ডুবে আছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ১১ জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। জেলাগুলো হলো—কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর, রাজবাড়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ২২টি স্টেশনের পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া ১০১টি স্টেশনের মধ্যে ৭৮টি নদীর পানি বেড়েছে। ২০টি নদীর পানি কমেছে। অপরিবর্তিত আছে তিনটি নদীর পানি।

অনেক এলাকায় স্রোত বেড়ে নদীভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা অপ্রতুল। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

নীলফামারী : গতকাল ভোর ৬টায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত রবিবার রাত ১২টায় সেখানে পানিপ্রবাহ ছিল রেকর্ড বিপত্সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপরে। ওই সময় তিস্তা ব্যারাজসহ আশপাশের এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরপর পানি কমতে শুরু করলে গতকাল সকাল ৯টার দিকে ওই ‘রেড অ্যালাটর্’ প্রত্যাহার করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে তিস্তার সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ ছিল ৫৩.১০ সেন্টিমিটার। এ সময় বিপত্সীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে পানিপ্রবাহ ছিল। ২০০৭ সালে ছিল ৫৩.৫ সেন্টিমিটার এবং  ১৯৯৬ সালে ছিল ৫৩.৩ সেন্টিমিটার। তিস্তার এমন অগ্নিমূর্তিতে ওই রাতে ব্যারাজ এলাকায় ছুটে আসেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ। প্রস্তুতি নেন ঢলের পানি বাইপাস করার। কিন্তু রাত ১২টার পর আর পানি না বাড়ায় ফ্লাড বাইপাস আর খুলতে হয়নি। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানায়, ফ্লাড বাইপাস খোলার জন্য বাকি ছিল আর মাত্র ৯ সেন্টিমিটার পানিপ্রবাহ। ১৯৯৬, ১৯৯৮, ২০০৭ ও ২০১৭ সালে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে খোলা হয়েছিল ওই ফ্লাড বাইপাসটি।

উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে গত শুক্রবার। সেই থেকে বিপত্সীমার ওপরে চলছে পানিপ্রবাহ। টানা চার দিনের ঢলে ডিমলার ১৫ গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এখন পানি কমতে শুরু করলেও ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে রেখে সতর্কাবস্থায় রয়েছি।’ ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য ৬০ মেট্রিক টন চাল, এক লাখ টাকা ও ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ এসেছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকেলে ধরলার পানি বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার,  ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার এবং তিস্তার পানি ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ৯ উপজেলার পাঁচ শতাধিক গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে ধরলা নদীর পানির প্রবল চাপে সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ২০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, বাঁধটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। তবে বিকল্প বাঁধটি রক্ষার জন্য বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছিল। কিন্তু পানির প্রবল চাপে শেষ পর্যন্ত বাঁধটি ভেঙে যায়। জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় ৪৩৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৪০০ মেট্রিক টন চাল, ১১ লাখ টাকা ও তিন হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এদিকে নাগেশ্বরীতে ভারত থেকে বন্যার পানিতে দুধকুমর নদে ভেসে এসেছে অচেনা এক যুবকের লাশ। গতকাল দুপুরে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের বড়মানী আদর্শ বাজার এলাকা থেকে এ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটার নদীতীরবর্তী আরো কিছু এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তিনটি ইউনিয়নের চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের ৩৫ হাজার মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপত্সীমার ৬৭ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে করতোয়ার পানি বাড়লেও তা বিপত্সীমার ৫৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

সিরাজগঞ্জ : চার দিন ধরে যমুনা নদীর পানি বাড়তে থাকায় সোমবার সকালে পানি দ্বিতীয় দফায় বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি ১৭ সেন্টিমিটার বেড়ে সোমবার সকালে বিপত্সীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। যমুনা নদীর পানি দ্বিতীয়বার বিপত্সীমা অতিক্রম করায় সিরাজগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলার এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ বন্যার ভোগান্তিতে পড়েছে।

রংপুর : রংপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। গঙ্গাচড়ায় তিস্তার ডানতীর রক্ষা বাঁধটি (মূল বাঁধ) মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে সেখানকার নদীতীরবর্তী মানুষ।

দিনাজপুর : জেলার প্রধান তিনটি নদী বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। গতকাল দুপুরে শহরের হঠাৎপাড়া, নতুনপাড়া, জামাইপাড়া, দপ্তরিপাড়া, বাঙ্গিবেচা ঘাটের কিছু এলাকাসহ বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

পঞ্চগড় : ভেঙে গেছে পঞ্চগড়ের মীরগড় এলাকার করতোয়ার কাঠের সাঁকোটি। পানির প্রবল চাপে রবিবার মধ্যরাতে ৪০০ মিটার দীর্ঘ সাঁকোটির বেশির ভাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে ধাক্কামারা ও গড়িনাবাড়ী ইউনিয়নের সঙ্গে ওপারের সাতমেরা ও দেবনগর ইউনিয়নের লাখো মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ শহরে সুরমার পানি বিপত্সীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে নতুন করে অন্য কোনো এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : গত শুক্রবার থেকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। ১৫ দিন ধরে তাহিরপুরের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ২৩০টি গ্রাম ও ১৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। উপজেলার ছোট-বড় ৩০টি হাট-বাজারের সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার দুই হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরে বন্যার পানি বেড়েছে। গতকাল সোমবার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, গতকাল ভোর থেকে চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের দাসনাগাঁও গ্রামে বন্যার পানি বাড়তে থাকে। সকালের দিকে গ্রামের অনেকের বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ে।

রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে ফের পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মায় পানি বেড়েছে ১৩ সেন্টিমিটার। গত রবিবার পদ্মার পানি বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সোমবার তা ১৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার পানি বেড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন।

ফেনী: পানির চাপে পরশুরাম ও ফুলগাজীর মুহুরী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ছয় স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর ফলে বির্স্তীণ এলাকায় পানি ঢুকে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের, ডুবে গেছে মুরগির খামার ও বীজতলা। বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ।

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) : যমুনার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বেড়ে বিপত্সীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয় বিভিন্ন নদ-নদীর পানিও হু হু করে বাড়ছে। এতে নদীর পার, বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ ও নদী রক্ষা বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : বন্যায় কলমাকান্দায় এক হাজার ৬০৪টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন অনেক চাষি।

শেরপুর : পাহাড়ি ঢলে নালিতাবাড়ী, নকলা ও ঝিনাইগাতীর পাঁচটি ইউনিয়নের ১৫ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ। ঢলের তোড়ে নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর দুটি স্থানে প্রায় ৩০০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা