kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

আত্মজীবনী লিখতে নিজেকে গোছাচ্ছি

হেলাল হাফিজ

আজিজুল পারভেজ   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




আত্মজীবনী লিখতে নিজেকে গোছাচ্ছি

‘আমার শরীরটা ভালো না, খুব অসুস্থ। ডায়াবেটিস বেড়ে গেছে। চোখের গ্লুকোমা তো আছেই। শরীরও খুব দুর্বল হয়ে পড়ছে। বয়স হলে যা হয় আর কি। এর মধ্যে সাড়ে তিন মাসের গৃহবন্দি জীবন একেবারে কাবু করে ফেলেছে।’ কেমন আছেন জানতে চাইলে নিজের অবস্থা সম্পর্কে এভাবে জানালেন ভালোবাসা ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ।

যৌবনের জয়গান গাওয়া দেশের তুমুল জনপ্রিয় এই কবি করোনাকালীন অবস্থান করছেন বড় ভাইয়ের বাসায়। ৭২ বছর বয়স্ক চিরকুমার এই কবির আবাসস্থল ছিল রাজধানীর একটি হোটেলকক্ষ। সময় কাটত জাতীয় প্রেস ক্লাবে। খাওয়াদাওয়াও করতেন প্রেস ক্লাবেই। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমার তো গৃহ বলতে ছিল প্রেস ক্লাব। লোকে বলে তাদের সেকেন্ড হোম হলো ক্লাব। যেকোনো ক্লাব। কিন্তু আমার ফার্স্ট হোম হলো প্রেস ক্লাব। সারা জীবন প্রেস ক্লাবেই কেটেছে। দুই বেলা নাশতা। দুই বেলা খাবার। ৪৭ বছর থেকে প্রেস ক্লাবেই সেরেছি। ক্লাব যেদিন লকডাউন হলো সেদিনই বড় ভাই তাঁর বাসায় নিয়ে এসেছেন। সাড়ে তিন মাস যাবৎ বড় ভাইয়ের বাসায়ই আছি। এখানে আরামেই আছি। খাওয়াদাওয়াও হচ্ছে ভালোই। বড় ভাইয়ের নাতি-নাতনিরা আছে।

তাদের সঙ্গে ভালো সময় কাটছে। তার পরও সারাজীবন তো গৃহহীনের জীবন কাটাচ্ছি। উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি। এখন এই সাড়ে তিন মাসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। গৃহবন্দি জীবন।’ সময় কিভাবে কাটছে জানতে চাইলে বলেন, ‘সময় কাটানোর সবচেয়ে বড় ও সুন্দর উপাদান হলো বই পড়া। বই পড়ছি। চোখের সমস্যা থাকার কারণে একটানা বেশিক্ষণ পড়তে পারি না। তার পরও বই পড়েই বেশির ভাগ সময় কাটাচ্ছি। ফেসবুকিং করি। যেহেতু বয়সও হয়েছে, সময় হয়েছে তাই ঘুমাই। টিভি দেখা হয় না।’

দেশের সর্বাধিক বিক্রীত কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ এর কবি হেলাল হাফিজের কাছে লেখালেখি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, “আমি তো এমনিতে খুব অলস। সারা জীবনে কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ আর তার ৩৪ বছর পর ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’। তাও কবিতা তো অল্প, মাত্র ৩৫টি। এখন অল্প কিছু পুরনো কবিতা ঘষামাজা করছি। এগুলো ‘যে জলে আগুন জ্বলে’তে নেই, ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’তেও নেই। এগুলো একটু দুর্বল রচনা। আপ টু দ্য মার্ক হলে এখান থেকে কিছু কবিতা পরের বইয়ে যাবে। নতুন, একেবারে আনকোরা কবিতা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারিনি। লিখতে গেলে তো আগে বেশ কিছু পড়াশুনা করতে হয়। সেটি খুব কম হচ্ছে। চোখের কারণে পারছি না। শরীরও খুব দুর্বল। ডায়বেটিস বেড়ে গেছে। প্রেশার আছে। সব মিলে শরীর একটু মন্দই যাচ্ছে। তারপর যেহেতু অখণ্ড অবসর। আর কোনো কাজ নেই। চেষ্টা করছি নতুন কিছু কবিতা যদি হয়। সেটা চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ কিছু হয়নি।”

তাহলে নতুন কবিতার বইয়ের প্রস্তুতি চলছে, কবে হতে পারে—জানতে চাইলে কবি বলেন, ‘১০টির মতো কবিতা রেডি আছে। আরো অন্তত ৪০টি কবিতা লাগবে বইয়ের জন্য। তাই নতুন কবিতার বই হতে দেরি হবে, বহু দেরি হবে। টার্গেট আমার এখন দুটি। একটি কবিতার বই আর পরমায়ু যদি কুলায় আত্মজীবনীটা লিখব। এই দুইটাই ইচ্ছা আছে। এখন পরমায়ু কুলাবে কি না জানি না। বা লিখে উঠতে পারব কি না তাও বুঝে উঠতে পারছি না।’

আত্মজীবনী লেখার কাজটা কতদূর—জানতে চাইলে বলেন, ‘আত্মজীবনীর কিছু কিছু নোট করছি। নিজের ভেতরে গোছাচ্ছি আগে। কোনটার পর কোনটা। আমি তো কোনো কিছু গোপন করব না। যা কিছু হয়েছে আমার জীবনে সবই বলব। তাই মন ও মগজে আগে গোছাচ্ছি। একটু একটু নোট করে গুছিয়ে নিচ্ছি। এইটাই মূল টার্গেট। এর চেয়ে বেশি কিছু পরমায়ুতেও কুলাবে বলে মনে হচ্ছে না।’

স্বেচ্ছা গৃহবন্দি এই সময়ে কোন জিনিসটার সবচেয়ে অভাববোধ করছেন—জানতে চাইলে কবি বলেন, ‘শৈশব থেকেই আমি উদ্বাস্তু। মা মারা গেছেন তিন বছর বয়সে। তখন থেকেই গৃহহীনজীবী। উদ্বাস্তু জীবন। উড়নচণ্ডী জীবন। কিন্তু সব কিছু স্তব্ধ হয়ে গেছে করোনাভাইরাসের কারণে। জীবনের প্রায় ৫০ বছর কেটে গেল প্রেস ক্লাবে। প্রথম যৌবন, মধ্য যৌবন, পরিণত যৌবন এবং প্রৌঢ়কাল, পুরোটা প্রেস ক্লাবে কেটে গেল। প্রেস ক্লাবটাকে খুব মিস করি। গৃহ বলতে তো আমার প্রেস ক্লাবই। আর কিছু নেই। গৃহস্বাদ আর কোথাও পাইনি আমি।’

করোনাকাল কেটে গেলে প্রথমেই কী করতে চাইবেন—জানতে চাইলে সংসার বিরাগী এই কবি বলেন, ‘প্রথমেই আবার নিঃসঙ্গ জীবনেই ফিরে যাব এই কোলাহল থেকে। পরিবার তো একটি কোলাহলও বটে। নিসঙ্গতার কাছেই ফিরে যাব। সেখানে গেলে হয়তো লেখালেখির জন্য সুবিধাও হতে পারে। এখন তো পারছি না। খাব কোথায়? প্রেস ক্লাব তো বন্ধ। হোটেলে খাওয়াও তো রিস্কি।’

করোনাকালীন একটি ঘটনা কবিকে খুবই আপ্লুত করেছে। তাঁর কোনো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ছিল না। যে ফোনটা ছিল সেটাকে তিনি ‘বরফ যুগের এনালগ ফোন’ বলেন। ইন্টারনেট সংযোগের সুযোগ নেই। অথচ তিনি ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। প্রেস ক্লাবের মিডিয়া সেন্টারের কম্পিউটারে ফেসবুকিং আর লাইব্রেরিতে বই পড়েই সময় পার করতেন। এখন তো এই দুটিই বন্ধ। চোখের সমস্যার কারণে বেশি বই পড়তেও পারছেন না। আর অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল না থাকায় গৃহবন্দি অবস্থায় সময় কাটাতে সমস্যা হচ্ছে। ফেসবুকিং করতে হলে বড় ভাইয়ের নাতি ফারহানকে বিরক্ত করতে হয়। তাঁর মোবাইল নিয়ে সকালে বিকেলে ১৫-২০ মিনিট করে ফেসবুকিং করতে হয়। কিন্তু তাঁরও তো গৃহবন্দি জীবন। তার ওপর অনলাইনে কোচিং চলে। তাই অ্যান্ড্র্রয়েড মোবাইল না থাকায় অসুবিধাই হচ্ছে। গত ঈদে একটি জাতীয় দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলো বলেছিলেন। এটা পড়ে বার্তাটুয়েন্টিফোর এর প্রধান সম্পাদক আলমগীর হোসেন একটি অ্যান্ড্র্রয়েড মোবাইল ফোন বাসায় পাঠিয়ে দেন। কবি বলেন, ‘এটা পেয়ে আমি তো আপ্লুত। আমার চোখ ভিজে এসেছিল। ভালোবাসাও তো মানুষকে কাঁদায়। বাসার সবাই এটা নিয়ে উৎসবের মতো করল। কয়টি কবিতার জন্য মানুষের যে কী ভালোবাসা। কত ভালোবাসা যে পেলাম মানুষের।’

করোনাকালীন সম্পর্কে কবি হেলাল হাফিজ বলেন, ‘এমন একটি বিপর্যয়, পৃথিবী নামক গ্রহটাকে তো নাড়িয়ে দিয়েছে। পৃথিবী থেকে তো বহু প্রজাতি, জীবজন্তু ধ্বংস হয়ে বিলীন হয়ে গেছে। এখন মানবজাতিও বিলীন হওয়ার পথে এটা প্রথম পদক্ষেপ কি না, পাঁচ হাজার, ১০ হাজার, ৫০ হাজার বছরের মাথায় গিয়ে মানবপ্রজাতি বিলীন হয়ে যায় কি; এমনটাও কেউ কেউ ভাবছে। একটি দুর্বিষহ অবস্থা, একটি অসহায় অবস্থা, কেউ কিছু করতে পারছে না। ছোট একটি ভাইরাসের কাছে পৃথিবী পরাজিত বলব না, কিন্তু স্তব্ধ হয়ে গেছে। যত দ্রুত ভ্যাকসিনটি আবিষ্কার হয় ততই মঙ্গল।’

করোনাকাল মানুষের জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে কি না সে সম্পর্কে অভিমত জানতে চাইলে ভালোবাসার এই কবি বলেন, ‘মানুষের মনোজগতে যদি প্রেমটা জাগ্রত হয় এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষ যদি সহানুভূতিশীল হয় সেটাই হবে বড় পাওয়া। এই যে বিনা পয়সায় অক্সিজেন আমরা এতকাল পেয়ে এসেছি সেটির একটু টান পড়লে যে কী অবস্থা হয় সেটি তো এই করোনা বুঝিয়ে দিল। সেটির জন্য আমরা কী করতে পারি। অক্সিজেন যাতে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয় সেটি তো মানুষের আয়ত্তের মধ্যেই আছে। কয়েকটি গাছ লাগানো, সেটা তো বড় কিছু নয়। কিন্তু সেটা তো আমরা করছি না। এই ধাক্কায় আমার ধারণা, যুদ্ধবিগ্রহ না করে মানুষের ভেতরে বোধ হয়—পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার বিষয়টি নতুন করে জেগে ওঠার সম্ভাবনা আছে। এটা আমার বিশ্বাস, এটাই শোভন হবে মানব প্রজাতির জন্য। ভালোবাসাটা যদি সারা পৃথিবীর মানুষ  হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। তা হলেই মানুষ সারভাইব করতে পারবে।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা