kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

কক্সবাজার সৈকত

সাগরলতার আলপনা

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাগরলতার আলপনা

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে কোলাহল নেই, মানুষের পদচারণও নেই। এই সুযোগে প্রকৃতি যেন ডানা মেলছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাগরলতা। যেন সৈকতের নরম বালুতে সবুজের নতুন আলপনা। সবুজের বাঁকে বাঁকে গোলাপি ফুলের ঝিকিমিকি। কক্সবাজারের মানুষের মুখের ভাষায় এই লতার ডাকনাম ‘ডাউঙ্গা’। কেউ কেউ বলে ‘ডাউগ্যা’, আবার কারো কাছে ‘পেঁয়াজ লতা’। ইংরেজি নাম  Railroad vine, বাংলায় দাঁড়ায় ‘রেলপথ লতা’। দেখতে একেবারেই রেলপথের অবিকল। একদিকে সাগরের ফেনিল ঢেউ, অন্যদিকে বালিয়াড়ির সাগরলতার আচ্ছাদন। যেন প্রকৃতির সাজানো বাগান।

করোনার এই দুঃসময়ে যেন সুসময় চলেছে এই দ্রাক্ষালতার। সৈকতের বালুচরে পা পড়ছে না পর্যটকের। সেই নির্জনতার সুযোগে কক্সবাজার সৈকতের বিস্তৃত বালিয়াড়িজুড়ে নিঃসংকোচে জাল বিছিয়ে চলেছে এই সাগরলতা। যেন নবযৌবনা! সামুদ্রিক জোয়ারের তীব্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করে সৈকতে সৃষ্টি করে চলেছে নতুন নতুন বালিয়াড়ি। সাগরলতাও আস্তে আস্তে সৈকতজুড়ে একক আধিপত্য জানান দিচ্ছে। একেকটি সাগরলতা লম্বা হতে পারে ১০০ ফুটেরও বেশি। লতাটির রয়েছে আশ্চর্য সব গুণ। এই গুণে বিমোহিত কক্সবাজার জেলা প্রশাসনও। এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন সাগরলতা সংরক্ষণে বাস্তবিক কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। সৈকতের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে সাগরলতার বনায়নের মাধ্যমে বালিয়াড়ি তৈরির ইতিহাস নতুন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সৈকতের হ্যাস্টিং পয়েন্টে সাগরলতার মাধ্যমে বালিয়াড়ি সৃষ্টিতে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

তিন দশক আগেও সৈকতের বালিয়াড়িতে ছিল সাগরলতা। সবুজ পাতার দীর্ঘ এসব লতার ডগায় ডগায় ছিল গোলাপি ফুলের সাজ। ওই সময় সৈকতেও ছিল বালির ঢিবি। উপকূলের কুতুবদিয়া থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত এ ধরনের বহু বালিয়াড়ি দেখা যেত। সমুদ্রতীরের বাসিন্দারা এ ধরনের বালিয়াড়ি ঘিরেই লোকালয় তৈরি করত। একসময় এই লোকালয়গুলো ‘ডেইলপাড়া’ উপাধি পায়। এসব বালিয়াড়িতে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা। সৈকতের বালুচরে অসংখ্য পর্যটকের পায়ে পিষ্ট হয়ে একসময় দেউলিয়া হয়ে যায় উদ্ভিদটি। যেন দপ করেই নিভে যায় সমুদ্রসৈকতের ‘প্রাকৃতিক সবুজ ছবি’। পর্যটকের পা না পড়ায় সে সময়টাতে কিছু বালিয়াড়ি অক্ষত ছিল, সেখানে এখনো টিকে আছে সাগরলতা। করোনার সময়ে নির্জনতার সুযোগে সেই সাগরলতা ফের জীবনের ছন্দ খুঁজে নিল।

কক্সবাজারের দরিয়ানগরেই দেখা গেল, সাগরলতা বিনা বাধায় সৈকতে জাল ছড়াচ্ছে আর উড়ন্ত বালু সেই লতায় আটকে নতুন নতুন বালিয়াড়ি তৈরি করছে। প্রথমে স্থানীয় উদ্যোগে সৈকতে পরীক্ষামূলক সাগরলতার বনায়ন করা হলেও এখন এগিয়ে এসেছে সরকার। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, কক্সবাজার সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটি সাগরলতা সংরক্ষণের জন্য প্রথম ধাপে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই টাকায় দরিয়ানগর ও হিমছড়িতে দুটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। বালিয়াড়ি ও সাগরলতা সংরক্ষণে দরিয়ানগর সৈকতের কিছু এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে। আর তা সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের।

সাগরলতার বনায়ন ও তদারকির দায়িত্ব পাওয়া স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক আহমদ গিয়াস বলেন, কয়েক মাস আগে জেলা প্রশাসন সাগরলতার বনায়ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার পর সৈকতে কিছু ঘেরাবেড়া হয়েছে। এতে সাগরলতা বিনা বাধায় বেড়ে ওঠার ও বালিয়াড়ি তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। ফলে কয়েক মাসে সৈকতের ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত অগ্রবর্তী অংশে ছয় ইঞ্চি থেকে এক ফুট উচ্চতার নতুন বালিয়াড়ি তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন আগের পূর্ণিমার জোয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে বালিয়াড়ি চূড়া থেকে গড়ে ১৫ ফুট পেছনে ছিল। অর্থাৎ সাগরলতার বনায়নের কারণে এই সৈকতের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ১৫ ফুট বা তিন মিটার চওড়া নতুন জমি বের হয়েছে বঙ্গোপসাগর থেকে। সাগরলতা সমুদ্রসৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ এবং শুকনো উড়ন্ত বালুকে আটকে বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে। সাগরে ঝড়-তুফান বা ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলে ঠেকিয়ে রাখে বলে বালিয়াড়িকে সৈকতের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

সাগরলতা ন্যূনতম পুষ্টিসমৃদ্ধ বেলে মাটিতে বেড়ে উঠতে পারে। তার পানির প্রয়োজনীয়তাও কম হয়। উচ্চ লবণাক্ত মাটিও তার জন্য সহনশীল। এর শিকড় মাটির তিন ফুটের বেশি গভীরে যেতে পারে। এটি দ্রুতবর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ না পড়লে লতাটি চারদিকে বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ সামুদ্রিক জোয়ারের ওপরের স্তরের বালিয়াড়িতে জাল বিস্তার করে মাটিকে আটকে রাখে। এরপর বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে আসা বালু ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে মাটির উচ্চতা বাড়ায়। এতে সাগরলতার ও সৈকতের মাটির স্থিতিশীলতা তৈরি হয়।

কক্সবাজারের পরিবেশবিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম বলেন, ‘একসময় কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। কিন্তু সাগরলতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত তিন দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫০০ মিটারের বেশি ভূমি বিলীন হয়ে সাগর এগিয়ে এসেছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা