kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ায় ভারি বৃষ্টি, উজানের ঢল

সিলেট সুনামগঞ্জে বন্যার অবনতি

► অবনতির আশঙ্কা উত্তরাঞ্চলেও
► ফের বিপৎসীমার ওপরে তিস্তা
► বাড়ছে যমুনা-ধরলার পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিলেট সুনামগঞ্জে বন্যার অবনতি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ভারি বর্ষণের ফলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় এ দুই জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে।

দেশের উত্তরের জেলাগুলোতেও নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। তিস্তার পানি ফের বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এটিরসহ ধরলার পানি দ্রুতগতিতে বাড়তে পারে। ফলে এ অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা ৯ দিন কমতে থাকার পর যমুনা নদীর পানিও বাড়তে শুরু করেছে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, গত বৃহস্পতিবার প্রথম দেশের উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে, গতকাল শুক্রবার সক্রিয় হয়েছে সারা দেশে। ফলে বিভিন্ন জেলায় ভারি বর্ষণ হচ্ছে।

বন্যাদুর্গতদের অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। পাশাপাশি স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সার্বিক সহযোগিতা করতে সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছে মাউশি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৫৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া শিলংয়ে ১২০ মিলিমিটার, গোয়ালপাড়ায় ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১০১টি স্টেশনের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৭টি স্টেশনে পানি বেড়েছে, ৪২টিতে কমেছে, অপরিবর্তিত আছে দুটি স্টেশনের পানি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান,  ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিসের গাণিতিক আবহাওয়া অফিসের মডেল অনুযায়ী আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর মধ্যাঞ্চল এবং তত্সংলগ্ন ভারতের হিমালয়ে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়ে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে। ফলে এই সময়ে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বাড়বে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার দেশের প্রায় সব জেলাতেই বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে সুনামগঞ্জে ১৮৩ মিলিমিটার। নতুন করে ২৩ জেলায় বন্যা দেখা দেবে বলে আভাস দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। তাই এসব জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

নীলফামারী : তিস্তা নদীর পানি ফের বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। উজানের ঢলে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে।

এ অবস্থায় জেলার ডিমলা উপজেলার নদীবেষ্টিত পূর্ব ছাতনাই, টেপা খড়িবাড়ী, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছচাপনী, পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের পাঁচ হাজার পরিবার তৃতীয় দফায় বন্যার কবলে পড়েছে। টেপা খড়িবাড়ী ইউনিয়নে নতুন করে ভাঙনের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছে অন্তত ১৪টি পরিবার। এর আগের দুই দফা বন্যায় ডিমলার পাঁচ ইউনিয়নে ৬৯ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।’

গাইবান্ধা : পাঁচ দিন ধরে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন থেকে পানি নামতে শুরু করেছিল। তবে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় বাঁধে ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা ঘরে ফেরার পরিকল্পনা করেন। তাঁরা এখন আগামী দুই-তিন দিন নদ-নদীর অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

যদিও ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমার নিচে রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের কারণে ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা বেড়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে বৃহস্পতিবার থেকে চরাঞ্চলগুলোতে আবারও পানি ঢুকছে। আবার বন্যার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

শেরপুর : পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা মৃগী নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে নকলার ঐতিহ্যবাহী নারায়ণখোলা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির সামনের মাঠ এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ : টানা ৯ দিন কমতে থাকার পর যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ সদর ও কাজিপুর পয়েন্টে আবার বাড়তে শুরু করেছে। তবে এখনো তা বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পাঁচ সেন্টিমিটার বেড়েছে, কাজিপুর পয়েন্টে বেড়েছে তিন সেন্টিমিটার।

এদিকে চৌহালী উপজেলার বৈন্যা-রেহাইপুখুরিয়া-বিনানই সড়কের সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ধসে গেছে। এতে গত বৃহস্পতিবার থেকে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ : মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টায় সুরমার পানি বিপত্সীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় প্রতিটি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলার নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তাই আবারও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৬৫ সেন্টিমিটার।

মানিকগঞ্জ : পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর ১৫টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১৫ দিনে এসব এলাকার পাঁচ শতাধিক বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলসহ প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমি।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা