kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

সংকটকালে বহু ভালো আইডিয়াও জন্ম নিয়ে থাকে

মামুনুর রশীদ

আজিজুল পারভেজ   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সংকটকালে বহু ভালো আইডিয়াও জন্ম নিয়ে থাকে

“এমন একটা জীবন যাপন করছি আমরা; রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কর্মহীন জীবনযাত্রার গ্লানি’ আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি। আমরা কারো বাসায় যেতে পারি না। কেউ আমাদের বাসায় আসে না। সবাই যেন অনলাইননির্ভর হয়ে গেছে। এখন সবাই অনলাইনেই ব্যস্ত, কথাবার্তাও হচ্ছে অনলাইনে। এই অনলাইনটা তো এত পরনির্ভর, এত প্রযুক্তিনির্ভর! এটা তো সব সময় ভালোও লাগে না। কারণ আমি একটা লোককে দেখতে পাচ্ছি না, তার বডিল্যাঙ্গুয়েজ বুঝতে পারছি না। শুধু তার চেহারাটা দেখতে পাচ্ছি। তার মধ্য দিয়ে কথা বলছি। এই যে একটা ব্যাধি সমগ্র মানবজাতিকে অনলাইননির্ভর করে দিল, অজ্ঞাত শত্রুর কাছে আমরা বন্দি হয়ে গেলাম।” করোনাকালের সময়কে এভাবেই চিহ্নিত করলেন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ।

স্বাভাবিক সময়ে তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে রাত ১১টার দিকে ঘুমিয়ে পড়তেন। উঠতেন সকাল ৭টার মধ্যে। তারপর লিখতে বসতেন। কিন্তু করোনাকাল সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। সময়টা কিভাবে কাটছে জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘প্রথম দিকটায় সময়টা ভালোই কাটছিল। প্রচুর বই পড়তাম। সিনেমা দেখতাম। প্রতি রাতে দুই/তিনটা সিনেমাও দেখেছি। রাশিয়ান প্রথম দিককার ছবি, ইতালিয়ান ছবি; কলকাতার সত্যজিৎ-মৃণালের ষাট-সত্তরের দিকে দেখা ছবিগুলো আবার দেখেছি। এমনকি হলিউড-বলিউডের সিনেমাও দেখেছি। লেখালেখিও করেছি। কিন্তু এখন একটি ক্লান্তিকাল অতিক্রম করছি। এখন আর ভালো লাগছে না। কোনো কিছুই ভালো লাগছে না।’

তার পরও তো সময় যাচ্ছে। কিন্তু কিভাবে? একটু দম নিয়ে জানালেন সেটাও। ‘এই অবস্থায় ফুটবল খেলা দেখা শুরু করলাম। ইউরোপিয়ান কাপ, লা-লিগা। দর্শকবিহীন স্টেডিয়াম, ফুটবলাররা কেমন খেলে? কিন্তু ফুটবল খেলাটাও আমার কাছে মনে হয় একটা গতানুগতিকতার মধ্যে পড়ে গেছে। খেলার মধ্যেও কোনো বৈচিত্র্য যেন খুঁজে পাচ্ছি না। ইউরোপিয়ান কাপের এই খেলোয়াড়রা বিভিন্ন ক্লাবে খেলে। তাই তারা জানে কোন খেলোয়াড় কিভাবে খেলে। তারা যখন ডিফেন্সে কিংবা অফেন্সে যায় তখন মনে হয় যেন একটা ফর্মুলার মধ্যে পড়ে যায়।  তাই খুব ভালো লাগে না। এবার এটাও শুরু হয় সেই রাত ২টায়। এ অবস্থায় সমস্যা হচ্ছে, ঘুম হচ্ছে না। বিনিদ্র রাত কাটছে। সারা রাত জেগে ভোরে সূর্য উঠা দেখি, প্রখর সূর্যের সাংঘাতিক আলো চোখের মধ্যে এসে পড়ে। তারপর হয়তো ঘুম আসে।’

এর মধ্যে মন খারাপ করা খবরও যন্ত্রণার কারণ হচ্ছে মামুনুর রশীদের। ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে এত পরিচিত লোক মারা যাচ্ছে। গতকাল (বুধবার) মারা গেল ছড়াকার আলম তালুকদার, সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু, তার আগে আনিসুজ্জামান স্যার—বিশ্বাসই হয় না যে উনি মারা গেছেন। মারা গেলেন কামাল লোহানী, অবিশ্বাস্য মৃত্যু সব। একের পর এক মৃত্যু এটাও একটা ডিপ্রেশনের কারণ হচ্ছে।’

করোনা পরিস্থিতির কিছু বিষয় ভাবিয়ে তুলছে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি নিয়ে নিয়ত সোচ্চার এই ব্যক্তিত্বকে। তিনি বলেন, ‘শারীরিকভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি আমরা। শুধু যে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি, তা না। সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হচ্ছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কথা। তারা সমাজটাকে ভেঙে দিতে চাচ্ছে। সমাজটাকে নতুন করে একটা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে চালু করবে। যে সমাজ আমরা জেনে এসেছি, মানুষ একটা যূথবদ্ধ প্রাণী। সামাজিক প্রাণী হিসেবে একজনের সঙ্গে অন্যজনের আদান-প্রদান, ভালোবাসা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই মানবজাতির বসবাস লক্ষ বছর থেকে। সেই জায়গায় এখন বলছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। অদ্ভুত শব্দের ব্যবহার। সমাজ কি থাকবে না? সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তো করছেই, সামাজিক ব্যবসাও করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেগুলো জমেনি। এখন সমাজ শব্দটার ওপর আঘাত হানছে।’

করোনাকালের পরে সমাজটা কেমন হবে, পৃথিবীটার অবস্থা কেমন হবে সেটাও ভাবাচ্ছে মামুনুর রশীদকে। তাঁর মতে, ‘পৃথিবীটা এক দিক দিয়ে নষ্ট পৃথিবী হয়ে যেতে পারে। আরেক দিক থেকে হয়তো পৃথিবীর মানুষ একে অপরকে নিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করবে। কিন্তু যে অভ্যাস মানুষের মধ্যে গত চার মাসে হয়ে গেছে, সেগুলো তো খুব খারাপ। যেমন কেউ কাউকে তীব্রভাবে অনুভব করছে না। অনুভবের যে তীব্রতা, যেখান থেকে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের জন্ম, তা কেউ বোধ করছে না। কারো সঙ্গে দেখা হচ্ছে না, মনে করছে একটা ফোন করলেই হয়ে যাবে। ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ডে কত ব্যবস্থা। ছবি দেখা যায়। ছবি দেখে দেখে কথা বলা যায়।’

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে পৃথিবীটাকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ডি-হিউমেনাইজ বা বি-মানবিক করার চেষ্টা হচ্ছে। বহু বছর থেকে ডি-হিউমেনাইজ ওয়ার্ল্ডের চেষ্টা হচ্ছে। সনি কম্পানির প্রধান একবার বলেছিল, পৃথিবীটাকে আমরা একটা স্বাতন্ত্র্যবোধের মধ্যে নিয়ে যাব। দুই মাস পরে তারা আবিষ্কার করল ওয়াকম্যান। মানুষ একা গান শুনবে। কী ভয়ংকর জিনিস! গান তো আমরা সামাজিকভাবে শুনতাম। একটা বাড়িতে ভিডিও কিংবা টেলিভিশন বাজছে, কিংবা একটা ক্যাসেট বাজছে, পরিবারের সবাই, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীরাও একসঙ্গে বসে উপভোগ করছে। কিন্তু ওয়াকম্যান আসার পর দেখা গেল বাড়ির কনিষ্ঠ ছেলেটি কানে হেডফোন দিয়ে একা একা গান শুনছে আর দুলছে। এখন তো প্রত্যেকের কানে হেডফোন, সামনে কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোন। এই যে ডি-হিউমেনাইজ ওয়ার্ল্ড যেটা ইন্টারনেট করেছে, সেই ডি-হিউমেনাইজ ওয়ার্ল্ডের জয় হবে, নাকি আমরা আবার সামাজিক পৃথিবীতে ফিরে আসব। এটা কিন্তু প্রত্যেক মানুষ ঘরে বসে ভাবছে।’

আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে আশাবাদের কথাও শোনালেন মামুনুর রশীদ। বললেন, ‘ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই দেখব, সংকটকালে অনেক ভালো ভালো আইডিয়ার জন্ম হয়েছে। প্লেগের সময় শেকসপিয়ার অসাধারণ সব নাটক লিখেছেন। প্লেগের পরই শিল্প বিপ্লবের যাত্রা হয়েছে। এ রকম কিছু হতে পারে, এ রকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাই। পৃথিবীতে যে অসাম্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের যে দুর্বৃত্ত, মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে, এদেরও একটা বিনাশ প্রয়োজন। হয়তো বা এই সংকট কেটে গেলে এটারও একটা পথ আমরা খুঁজে পাব।’

সৃষ্টিশীল কাজেও নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব। জানালেন, একটি নতুন মঞ্চনাটক লেখার পরিকল্পনা করেছেন। খসড়াও তৈরি হয়েছে। এবারের বিষয় লুণ্ঠন। রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হবে। নাম হতে পারে ‘দুধে ভাতে’। একটা চলচ্চিত্র নির্মাণেরও ভাবনা তৈরি হয়েছে। আরেকটা বড় কাজ করছেন। আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছেন। ষাটের দশক শেষ করে মুক্তিযুদ্ধ পর্ব লিখছেন।

ঘুমানোর সময়টা বাদ দিলে প্রতিটি সময়ই যাঁর কাটে নাটক, অভিনয়, অনুষ্ঠান নির্মাণ কিংবা সাংগঠনিক কাজে, সেই মানুষটি এই কারোনাকালেও বাসায় থেকে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছেন। মিডিয়া ও থিয়েটারের প্রায় এক হাজার ২০০ জন নিম্ন আয়ের শিল্পী ও কলাকুশলীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাঁদের উদ্যোগে।

৭২ বছর বয়সী মামুনুর রশীদ স্ত্রীকে নিয়ে বাস করেন ঢাকায়। মেয়ে ধানমণ্ডিতে থাকেন, নিয়মিত এসে খোঁজখবর নেন। ছেলে বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা