kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালে নতুনত্ব এসেছে ব্যবসায়

রোকন মাহমুদ    

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনাকালে নতুনত্ব এসেছে ব্যবসায়

নতুন করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারি বদলে দিয়েছে পৃথিবীকে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন, অভ্যাসসহ অনেক কিছু। এসবের প্রভাব পড়েছে পণ্যের বাজারেও। বিলাসপণ্যের চাহিদা কমে গিয়ে বেড়েছে করোনায় সুরক্ষা পণ্যের ব্যবহার। তাই প্রয়োজন কিংবা ব্যবসা বাঁচাতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বদলেছে তাদের উৎপাদনের কৌশল। ব্যবসায় নতুনত্ব ও পণ্য বহুমুখীকরণে ঝুঁকছে দেশের অনেক ব্র্যান্ড কম্পানি। করোনাকালে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়েছে—এমন পণ্য উৎপাদন করছে তারা। পণ্য বৈচিত্র্যকরণে বেসরকারি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানও।

এ ছাড়া বাজারে আগে থেকে থাকা পণ্যের প্রচারেও আনা হয়েছে ভিন্নতা। এটাও করোনায় তৈরি হওয়া বাজার ধরার প্রচেষ্টা। পণ্যের প্রচারে থাকছে করোনা সম্পর্কিত সচেতনতা ও রোগ প্রতিরোধে পণ্যের উপকারিতার বিবরণ। এ ছাড়া বৈচিত্র্য এসেছে পণ্যের বিপণনেও। অনলাইনে বিক্রিটাকেই বেশি জোর দিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড কম্পানি প্রাণ-আরএফএল করোনার আগে খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করত। করোনার প্রাদুর্ভাবের পর কম্পানিটি তাদের উৎপাদন তালিকায় যোগ করেছে বেশ কিছু নতুন পণ্য। এ ছাড়া আগের উৎপাদিত পণ্যেও বৈচিত্র্য আনা হয়েছে।

জানতে চাইলে কম্পানিটির মার্কেটিং বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক কে এম জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বেশ কিছু সুরক্ষা পণ্য বাজারে এনেছি। গেটওয়েল লিমিটেডের এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফেস শিল্ড, সার্জিক্যাল গগলস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপিই ফুল গাউন, বডি ব্যাগ (মরদেহ বহনের ব্যাগ), উইস্ক কেবিন (নমুনা সংগ্রহের বুথ), স্নিজ গার্ড ও ডিজইনফেকশন চেম্বার।’

আরএফএল ছাড়াও গগলস ও ফেস শিল্ড উৎপাদন করছে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী কম্পানি ওয়ালটনসহ আরো অনেকেই। করোনার বিস্তারের পর স্কয়ারও তাদের পণ্যের তালিকায় যোগ করেছে ডিজইনফেকশন স্প্রে। এই স্প্রে ছাড়াও আরো দুটি হ্যান্ডওয়াশ পণ্য রয়েছে তাদের। হ্যান্ডওয়াশ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের নতুন কিছু পণ্য বাজারে ছেড়েছে এসিআই, বার্জারসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান।

এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই সরকারি প্রতিষ্ঠানও। সরকারি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন কেরু অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেড একসময় শুধু চিনি, ভিনেগার ও অ্যালকোহল উৎপাদন করত। করোনাকালে প্রতিষ্ঠানটি হ্যান্ড স্যানিটাইজারও উৎপাদন করছে।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নতুন এই পণ্য উৎপাদনের শুরুতে বলেছিলেন, করোনা আসার পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেখা দেয় হ্যান্ড স্যানিটাইজারের। তাই কেরু এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা করোনা-উত্তরকালেও থাকবে। তাই এতে লোকসানের চেয়ে লাভের সম্ভাবনাই বেশি।

বহুজাতিক বিদেশি কম্পানি ইউনিলিভার বাংলাদেশ তাদের উৎপাদন সারিতে নতুন কোনো পণ্য সংযোজন না করলেও আগের লাইফ বয় হ্যান্ডওয়াশের উৎপাদনই বাড়িয়েছে কয়েক গুণ। কম্পানির পণ্যের প্রচারেও দেখা গেছে করোনার প্রভাব।

রং উৎপাদনকারী ব্র্যান্ড কম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদশ লিমিটেড নিজেদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারে নিয়ে এসেছে। কম্পানির মহাব্যবস্থাপক এ কে এম সাদেক নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারি আমাদের জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দেশের সবচেয়ে পুরনো ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে এ দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদেরও দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধের আওতায় বার্জার হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করা শুরু হয়েছে।’

এ ছাড়া পণ্য বহুমুখী ও বৈচিত্র্যকরণের কৌশল নিয়েছে পোশাক খাতের অনেক কম্পানিও। তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে আসায় অনেক কারখানাই এখন পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ও মাস্ক তৈরি করছে। দেশীয় কম্পানি রুট গ্রুপ অব কম্পানিজ তৈরি করছে করোনা কিলার ফেব্রিকস ও সুরক্ষা সামগ্রী। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই ফেব্রিকস করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ৯৯.৯৯ শতাংশ সুরক্ষা দেবে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এই ফেব্রিকস উদ্ভাবন করেছে।

এ বিষয়ে রুট গ্রুপ অব কম্পানিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাজ্জাকুল হোসেন টুটুল কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতি প্রায় থমকে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়ছে অনেক মানুষ। ‘করোনা কিলার’ সামগ্রী ব্যবহার করে যদি মানুষকে আবার তার কর্মে ফেরানো যায়, সে জন্যই তাঁদের এ উদ্যোগ।

করোনা রোগীদের জন্য অতি জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ভেন্টিলেটর উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে দেশি ইলেকট্রনিকস কম্পানি ওয়ালটন, মিনিস্টারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ফ্রিজ, টিভিসহ ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে পরিচিত এই ব্র্যান্ডগুলো এরই মধ্যে কয়েকটি সেমি-অটোমেটিক ভেন্টিলেটরের প্রটোটাইপ তৈরি করেছে। দেশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কার্যকারিতা পরীক্ষার পর ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন পেলে ভেন্টিলেটর উৎপাদন শুরু করতে চায় তারা।

জানতে চাইলে মিনিস্টার হাই-টেক পার্ক ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের (ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) পরিচালক এম এ রাজ্জাক খান রাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত রোগীদের যখন শ্বাসকষ্ট হয়, তখন অবশ্যই ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের সব হাসপাতালে ব্যাপক হারে ভেন্টিলেটর প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে আমরা ভেন্টিলেটর তৈরির কাজে হাত দিয়েছি।’

করোনায় শুধু পণ্যের উৎপাদনেই বৈচিত্র্য আসেনি। প্রচার ও বিপণনেও ভিন্ন কৌশল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রচারে ব্যবহার করা হচ্ছে করোনা সচেতনতার স্লোগান। আর বিপণনে নির্ভরশীলতা বেড়েছে অনলাইন ও টেলিবাণিজ্যে। এখন প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন বিক্রির সেবা চালু রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষক সংস্থা গ্লোবালডাটা এবং বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন থ্রিফট ও কনসাইনমেন্ট প্ল্যাটফর্ম থ্রেডআপ যৌথভাবে সম্প্রতি প্রকাশ করা এক বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছর পণ্যের অনলাইন বাজারের ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটবে। আর নিয়মিত খুচরা বিক্রির সংকোচন হবে ২৩ শতাংশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা