kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

‘বাচ্চা যহন খিদায় কান্দে, কইলজাডা ফাইট্টা যায়’

মো. আব্দুল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)    

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বাচ্চা যহন খিদায় কান্দে, কইলজাডা ফাইট্টা যায়’

এক বছরের শিশুপুত্র রৌদ্র চন্দ্র দাস আর স্ত্রী কণা রানী দাসকে (২২) নিয়ে রণজিৎ চন্দ্র দাসের (২৮) টানাটানির সংসারে আনন্দেরও কমতি ছিল না। গ্রামের বাজার থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি শেষে রাতে যখন বাড়ি ফিরতেন, একমাত্র শিশুপুত্রকে কোলে তুলে ভুলে যেতেন পরিশ্রমের সব ক্লান্তি। সেই শিশুপুত্র রৌদ্র এখন দুধ না পেয়ে রাত-দিন কান্না করছে। মহামারি করোনা কেড়ে নিয়েছে রণজিৎ চন্দ্র দাসকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় সংসারটির ওপর নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সমাজও তাঁদের একঘরে করে দেয়।

কণা রানী দাস চোখের জলে, রোদনের দীর্ঘশ্বাসে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, ‘রৌদ্দর বাপে দিন আনত, দিন খাইতাম, তার পরও অনেক সুহে ছিলাম। বাজারতে মাছ বেইচ্চা যত রাইতে আইত, রৌদ্দরে ঘুম থেকে তুইল্লা কোলে লইত, চুমা খাইত। এহনত আর কেউ লয় না। বাচ্চার দুধ কিনবার পাই না, দুধের টেহার লিগা মাইনসের কাছে আত (হাত) পাতুন লাগে। পেটের বাচ্চা যহন খিদার লিগা কান্দে, তহন কইলজাডা ফাইট্টা যায়। করোনা আমার সব কিছু শেষ কাইরা দিছে।’

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুঁটিজানা ইউনিয়নের দেবগ্রাম। ওই গ্রামের সুনীল চন্দ্র দাসের ছেলে রণজিৎ চন্দ্র দাস। গত ২৩ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান ময়মনসিংহ এসকে হাসপাতালে। তিন সদস্যের সংসার হলেও বৃদ্ধ মা-বাবা আর এক ভাইকে নিয়ে দেবগ্রামে নানাবাড়িতে বাস করতেন। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন রণজিৎ। জমিজমা বলতে কিছুই নেই। মাছ বিক্রি করে যা লাভ হতো, তা দিয়ে সংসার আর ভাই সনজিৎ চন্দ্র দাসের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। কয়েক মাস আগে রণজিতের লিভারে সমস্যা দেখা দেয়। সংসার চালাতে অসুস্থ শরীর নিয়েই বাজারে বাজারে মাছ বিক্রি করছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে গুরুতর অসুস্থ হলে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানেই তাঁর করোনভাইরাস পরীক্ষায় পজিটিভ আসে।

এ খবরে গ্রামের মানুষ তাঁর পরিবারকে একঘরে করে দেয়। রণজিৎ মারা গেলে নিজ গোত্রের মানুষের সহযোগিতায় তাঁর সৎকার করে পরিবার। গ্রামের মানুষ তাঁর বাড়িতে লাল নিশান উড়িয়ে লকডাউন ঘোষণা করলেও সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। এগিয়ে আসেনি স্থানীয় প্রশাসন কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থাও। সেই থেকে হতদরিদ্র পরিবারটি অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছে। রণজিতের মৃত্যুর পর এক আত্মীয় শিশু রৌদ্রকে কিছু খাবার কিনে দিয়েছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে সেই খাবার শেষ হয়ে গেলে শিশুটি এখন ক্ষুধার জ্বালায় রাত-দিন কাঁদছে।

গতকাল বিকেলে দেবগ্রামে রণজিতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে শিশুপুত্র নিয়ে অসহায় দাঁড়িয়ে আছেন কণা রানী। তাঁর চোখে-মুখে ভীষণ বিষাদ। কথা বলতে গিয়ে স্বামী হারানোর বেদনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভাঙা বাড়িঘর দেখে বোঝা যায়, পরিবারটি অত্যন্ত হতদরিদ্র। রণজিতের স্বপ্ন ছিল ভাইকে পড়ালেখা শিখিয়ে চাকরি করাবেন। এরপর ভাই সংসারের হাল ধরবেন। সংসারের দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। ভাই সনজিৎ এমএ পাস করে চাকরির জন্য অনেক ছোটাছুটি করলেও করোনা সব থামিয়ে দিয়েছে।

রণজিতের মা জিতা রানী দাস বলেন, ‘রণজিতের উপার্জনে সংসার চলত। করোনায় মৃত্যুর পর মানুষজন আর আগের মতো আমাদের সাথে মেশে না। অনেক সময় না খেয়ে থাকি। কেউ আমারার খোঁজ নেয় না।’

পুঁটিজানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দিন তরফদার বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ত্রাণ নিয়েছে কি না বলতে পারব না। করোনাভাইরাসে মৃত্যুর খবর শুনে ওই গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বলেছিলাম রণজিতের পরিবারের কোনো সমস্যা হলে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তারা কেউ যোগাযোগ করেনি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল সিদ্দিক বলেন, ‘করোনায় মৃত ব্যক্তির স্বজনরা সৎকারে পারদর্শী থাকায় তারাই সৎকার করেছে। এরপর তারা কেউ যোগাযোগ করেনি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা