kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

করোনায় ‘অলরাউন্ডার’ হয়ে উঠছি

রকিবুল হাসান

মাসুদ পারভেজ   

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায় ‘অলরাউন্ডার’ হয়ে উঠছি

প্রয়াত মোহাম্মদ আলফাজউদ্দিনের সন্তানরা যে কথা একদমই শুনতেন না, সেটিই কিনা এখন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন তাঁর এক মেয়ের জামাই। সুবোধ সেই জামাইয়ের নাম রকিবুল হাসান, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক।

এই করোনাকালে রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা ঘর মোছার ক্লান্তি ঝেড়ে গতকাল দুপুরে ফোনের ওপার থেকে বলছিলেন তিনি সেই কথাই, “আমার শ্বশুরমশাই তাঁর ছেলে-মেয়েদের টিভি দেখা পছন্দ করতেন না। বলতেন পত্রিকা পড়তে। তা-ও আবার যেনতেনভাবে পড়লে হবে না। তাঁর কথা হলো পড়তে হবে এভাবে, ‘ফ্রম দ্য নেম অব দ্য অথার টু দ্য নেম অব দ্য প্রিন্টার।’ মানে সবার ওপরে লেখকের নাম থাকে। আর একেবারে শেষ পাতার নিচে থাকে প্রকাশকের নাম। এমনিতেও পত্রিকার মনোযোগী পাঠক আমি এই করোনার সময়ে তাঁর কথামতো একেবারে ‘এ টু জেড’ পড়ে নিচ্ছি।”

পড়তে পড়তে ‘পত্রিকার লোক’ হিসেবে কখনো কখনো সাংবাদিকতা পেশার সংকট নিয়েও ভাবনায় ডুব দিচ্ছেন। নিজেও যে একসময় তা-ই ছিলেন। খেলা ছাড়ার পর পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন ইংরেজি দৈনিকে। পুরনো পেশার ক্রান্তিকালে নানা সমস্যার ফাঁক গলে ‘রান’ও বের করতে চাইলেন ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার সেঁটে ব্যাটিংয়ে নেমে ইতিহাস হয়ে যাওয়া এই ব্যাটসম্যান, ‘অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সংবাদপত্রও ধুঁকছে। এই পেশার পুরনো লোক হিসেবে যা আমাকে খুব ব্যথিতও করছে। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় ব্যবসা হলো ওষুধের। অথচ ওষুধ কম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। আমি সরকারকে অনুরোধ করব, এই নিষেধাজ্ঞা যেন তারা তুলে নেয়। ওষুধ কম্পানিগুলো যেন পত্রিকায় সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দিতে পারে। যা এই সংকটে প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য অনেকখানি সহায়ক হতে পারে।’

প্রায় চার মাস ধরে গৃহবন্দি রকিবুলের দেশ-জাতি নিয়ে গভীর ভাবনা যেমন আছে, তেমনি ঘরের ভেতর নিজের জগত্টাকে আনন্দময় করে তোলার চেষ্টারও অন্ত নেই, “আমার খুব মজা লাগছে। কেন  জানেন? আমি ঘরবন্দি হয়ে কভিড-১৯-কে ধন্যবাদই দিচ্ছি। কারণ আমরা ক্রীড়াঙ্গনের লোকরা সব সময়ই বহির্মুখী।

আমরা বাইরে থাকি, বাইরে আড্ডা মারি। এ জন্য আমাদের গৃহকর্ত্রীরা সব সময় নাখোশই থাকে। করোনাভাইরাসের কারণে তাদের খুশিও করতে পারছি। আবার হাদিসেও এ রকম একটি কথা আছে, ‘যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর কাছে ভালো, সে একজন ভালো মুসলমান।’ ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে সেদিক থেকেও বেশ কিছু পয়েন্ট আমি অর্জন করতে পারছি। হা হা হা...।” খেলোয়াড়ি জীবনে শুধুই ব্যাটসম্যান রকিবুলকে এই ঘরে থাকার সময়টি ‘অলরাউন্ডার’ও নাকি বানিয়ে ছাড়ছে, ‘এমনিতে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘর ঝাড়া-মোছা—এসব কাজ আমাদের স্ত্রীরা গৃহকর্মীর সহায়তা নিয়েই করে থাকে। কভিড-১৯ আমাদের পুরুষদের দিয়ে সেই ট্রেনিংও করিয়ে নিচ্ছে। আমাদের অলরাউন্ডার বানিয়ে ছাড়ছে আর কি! কেমন শুনুন। আমি এখন ঘর মুছি, বাসন মাজি ও ধোয়ামোছা করি। জীবনে ডিসিপ্লিনও আসছে তাতে। এ জন্য কভিড-১৯-কে আমি স্যালুটও জানাই।’

তাই বলে করোনাভাইরাসকে তিরস্কার করতেও ভুলে যাচ্ছেন না জীবনের ইনিংসে ৬৬ পার করে ফেলা রকিবুল, ‘স্যালুট জানানোর পাশাপাশি খুব বিরক্তও হচ্ছি। অনেক হলো তো! এত কেন? এবার একটু রণে ভঙ্গ দাও না! এবার তোমার তেজটা একটু কমাও না! একটু বাইরে যাই! মানুষকে তো খেয়েপরে বাঁচতেও হবে। এ জন্যই করোনাভাইরাসের ওপর রাগ আমার।’ খেলার লোক হিসেবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্থবিরতা পোড়াচ্ছে তাঁকে। তবে বিশ্বে খেলা এরই মধ্যে ফিরেছে, দর্শকবিহীন গ্যালারিতে হলেও। কাল থেকে সাউদাম্পটনে শুরু হতে যাওয়া ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট সিরিজও তাই আনন্দে ঝলমলিয়ে তুলছে রকিবুলের মুখ। ক্রিকেটের লোক অবশেষে টিভিতে হলেও ক্রিকেট দেখবেন যে! ক্রিকেট শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত টিভি দেখা ছাড়াও নানাভাবেই সময় কেটেছে তাঁর, ‘সময় কাটছে নানাভাবেই। টিভি দেখি। আমার ভারতীয় সিরিয়াল দেখার বাতিক আছে। জি বাংলায় দিদি নাম্বার ওয়ানও দেখি। ফোনে যোগাযোগ করি সবার সঙ্গে। আর নেটে থাকি। আমি আমার চেনাজানা সবাইকে প্রতিদিন সকালে শুভ সকাল জানিয়ে বার্তা পাঠাই। ম্যাসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে সুন্দর একটি গান, নয়তো সুন্দর একটি ফুলের ছবি দিয়ে শুভ সকাল জানাই। সবাইকে প্রশান্তির মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। দিনটা যাতে ভালোভাবে শুরু হয়। জোকসও পাঠাই। আমি চাই সবাই হাসুক।’ নিজেও বেশ ফুরফুরে থাকেন ভিডিও কলে নিকটজনদের সঙ্গে কথা বলে। তাঁর দুই ছেলের একজন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে, অন্যজন ঢাকায়ই। দুই বৌমা আর চার নাতি-নাতনির সঙ্গে রকিবুল আর তাঁর স্ত্রীর সারা দিনে কয়েক দফায় কথা বলা চাই-ই চাই। সময় তাই দিব্যি কেটে যাচ্ছে। এর মধ্যেই করোনা-পরবর্তী পৃথিবীর বাস্তবতা মানার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছেন রকিবুল, ‘আগামী যে কয় বছর আমরা বাঁচব, এই করোনাকে নিয়েই বসত করতে হবে আমাদের। ওকে নিয়েই ঘর করতে হবে। ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে হয়তো এই রোগটি প্রতিরোধ করবে, কিন্তু এটি যাবে না। কাজেই বাঁচতে হলে লড়াই করে যেতে হবে। নিজেকে সেই লড়াইয়ের উপযুক্তও করে তুলতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে জীবন চালাতে হবে। ব্যায়াম, ইয়োগা, হাঁটাহাঁটি করতে হবে। ইমিউনিটি বাড়াতে হবে। সে জন্য খাবার তালিকায় সবুজ জিনিস বাড়াতে হবে।’

 

মন্তব্য