kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

করোনায় মানবতার কিছু টুকরো গল্প

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় মানবতার কিছু টুকরো গল্প

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মা-বাবাকে হাসপাতালে ফেলে চলে গেছে ছেলে। বাবার মৃত্যুতে সন্তানকে কিংবা সন্তানের মৃত্যুতে দাফনে পাওয়া যায়নি বাবাকে। স্বামীর সৎকারের জন্য স্বজন বলতে স্ত্রীকে একা দেখা যায় শ্মশানে। করোনা আক্রান্ত রোগীকে ঘৃণার চোখে দেখে এলাকা থেকে তাড়ানোর গল্পও আছে। এমন সব অমানবিক খবর করোনার সময়ে চোখে পড়ছে অহরহ।

এর বাইরে কিছু মানবিকতার গল্প রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। করোনা আক্রান্ত বাবার চিকিৎসায় হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টাই সঙ্গে ছিলেন তিন ছেলে। করোনা আক্রান্ত বাবা মারা যাওয়ার পর মা আক্রান্ত হলে ছেলে তাঁর চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এতে ছেলে আক্রান্ত হলেও মাকে সুস্থ করে তুলতে পেরে খুশি। করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য নিজের বাড়িকেই আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন এক যুবক।

মায়ের পাশে ছেলে : করোনার উপসর্গ নিয়ে গত ৩০ মে মারা যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার নারায়ণপুরে বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম বন্দরের চাকরিজীবী আতাউর রহমান সেলিম। মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমানের ছেলে সেলিম বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে একরকম বিনা চিকিৎসায়ই মারা যান। মৃত্যুর পরদিন তাঁর করোনা পজিটিভ আসে। এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই স্ত্রী শাহীনূর আক্তারের শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় তাঁর অবস্থার অবনতি হলে শাহীনূর আক্তারকে ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পরই শুরু হয় মায়ের সঙ্গে ছেলের সংগ্রাম।

শাহীনূরের ছেলে তানভীর রহমান বলেন, ‘করোনায় বাবাকে হারিয়েছি, মাকে হারাতে চাই না বলেই সঙ্গে থাকার চ্যালেঞ্জ নিলাম। হাসপাতালে যাওয়ার পর যখন বলা হলো এখানে আলাদাভাবে কেউ দেখাশোনা করবে না তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম মায়ের সঙ্গে নিজেই থাকব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মায়ের সব ধরনের সেবা দিতে থাকলাম। তবে তিন দিন পর থেকে আমারও উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষায় আমারও করোনা পজিটিভ আসে। শেষ পর্যন্ত ১৯ জুন আমার মা ও ২৬ জুন আমার নেগেটিভ ফল আসে। আমরা দুজনই এখন সুস্থ।’

যুবকের বাড়িতে আইসোলেশন সেন্টার : নাসিরনগরে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা মার্জান ভূইয়া নামের এক যুবক। করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের আইসোলেশনে থাকার জন্য নিজের বাড়ির আটটি কক্ষ তিনি দিয়েছেন বিনা ভাড়ায়। বিষয়টি এলাকায় বেশ আলোচিত ও সমাদৃত। এরই মধ্যে ওই বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে কয়েকজন সদস্য সুস্থ হয়ে উঠছেন।

জানা গেছে, গত ২ জুন চার পুলিশ সদস্যের করোনা পজিটিভ আসে। পরদিন পুুলিশের আরো দুই সদস্য ও ১২ জুন আরেক পুলিশ সদস্যের করোনা পজিটিভ আসে। এ অবস্থায় থানা কমপ্লেক্সের ভেতরে করোনায় আক্রান্তদের থাকা নিরাপদ না হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা করা হয়। এ অবস্থায় থানার ওসি মো. সাজেদুর রহমান মার্জানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বাসা দিতে রাজি হন। পাশাপাশি জানিয়ে দেন, এর জন্য কোনো ভাড়া দিতে হবে না। মার্জানদের চারতলা ভবনের তিনতলার আটটি কক্ষকে পুলিশের আইসোলেশন সেন্টার বানানো হয়। সেখানেই পুলিশ সদস্যরা আইসোলেশনে থাকেন।

মার্জান জানান, সংকটময় মুহূর্তে পুলিশ সদস্যদের সামান্য সেবা করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

বাবার পাশে তিন ছেলে : আশুগঞ্জের ৭২ বছর বয়সী মতি মিয়ার জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসেন স্বজনরা। করোনা পজিটিভ এলেও বাবাকে ছেড়ে যাননি তিন ছেলে মাসুম, মোস্তাক ও মারুফ। বাবার সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ওই তিন ভাই দিন-রাত সঙ্গে ছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর বের হলে বিষয়টি বেশ প্রশংসা পায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মতি মিয়া যে কয় দিন ছিলেন সেখানে নিয়ম করে ছিলেন তিন ভাই। এক ভাই বিশ্রাম নিয়েছেন তো দুই ভাই করোনা বেডে বাবার পাশেই ছিলেন। বাবার খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন ওই তিন ভাই। শেষ পর্যন্ত মতি মিয়া সুস্থ হন। তবে ওই তিন ভাইয়ের কেউ করোনায় আক্রান্ত হননি।

স্ত্রীর ভালোবাসায় হেরে গেল করোনা : করোনায় আক্রান্ত হওয়া আখাউড়ার মনিয়ন্দ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আবুল বাশার হাজারী সুস্থ হয়েছেন। তাঁর এই সুস্থ হওয়ার পেছনে বড় অবদান রেখেছেন স্ত্রী সোহেলি আরফিন সুমী। স্বামীর সেবা দিতে গিয়ে তিনিও করোনায় আক্রান্ত হন। জানা গেছে, ঢাকায় কর্মরত আবুল বাশার হাজারীর উপসর্গ দেখা দিলে তিনি বাড়িতেই চিকিৎসা নেন। এ সময় তাঁর স্ত্রীকে আলাদা থাকতে বললেও তিনি সেটা করেননি। সেবা করতে গিয়ে একপর্যায়ে স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হন। কিন্তু তিনি মনোবল হারাননি। দুজনই নিয়ম মেনে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা