kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

বন্যা পরিস্থিতি

উত্তরে কিছুটা উন্নতি মধ্যাঞ্চলে অবনতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উত্তরে কিছুটা উন্নতি মধ্যাঞ্চলে অবনতি

দেশের উত্তরের কয়েক জেলার বন্যা পরিস্থিতি সার্বিকভাবে উন্নতির দিকে। নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার নিচে নেমে এসেছে। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপত্সীমার ওপরে থাকলেও ধীরে ধীরে কমছে। একইভাবে গাইবান্ধায় বহ্ম্রপুত্র ও তিস্তায় পানি কমছে অব্যাহতভাবে; যদিও তা এখনো বিপত্সীমার নিচে নামেনি।

নওগাঁয় আত্রাই নদীর পানি বইছে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে। আরো দক্ষিণে দেশের মধ্যাঞ্চলের দুই জেলা রাজবাড়ী ও মুন্সীগঞ্জে পদ্মার পানি কয়েক দিন ধরে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ ভৌগোলিক কারণে উত্তর থেকে দক্ষিণে গড়াচ্ছে বন্যার পানি। এতে উত্তরের জনপদে ক্রমে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোর অবস্থা অপরিবর্তিত। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নদীভাঙন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সমতল থেকে কমতে শুরু করেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। গঙ্গা ও পদ্মার পানি স্থিতিশীল আছে। মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে কমছে।

দেশে এখন মোট ১৪টি জেলা বন্যাকবলিত। এর মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী উদয় রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী দুই দিন বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। তবে আগামী ৯ জুলাই থেকে উজানের ঢল নামতে পারে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ভারি বর্ষণের কারণে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি আবার বাড়তে পারে। তখন বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

এলাকাবাসী ও কর্তৃপক্ষের বরাতসহ সরেজমিনে ঘুরে সংশ্লিষ্ট এলাকার কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত :

নীলফামারী : গতকাল বিকেল ৩টায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। শনিবার যা ছিল বিপত্সীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপরে।

ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গত ২৬ জুন তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপরে ওঠে। ২৯ জুন পর্যন্ত টানা তিন দিন এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি চরাঞ্চল ও গ্রামের পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের শিকার হয় অনেক পরিবার। পানি কমায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে পরিবারগুলোর মধ্যে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যার পর পানি বিপত্সীমার নিচে নামে। রবিবার আরো কমে বিকেল ৩টায় বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।’

কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি কমছে। গতকাল সকালে ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৫২ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে উলিপুরের সাহেবের আলগা, থেতরাই, রাজারহাটের জয়কুমর, কালিরহাট এবং সদর উপজেলার মোগলবাসা ও সারডোবে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেলায় চলতি বর্ষা মৌসুমে এ পর্যন্ত দুই হাজার পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে।

গাইবান্ধা : তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র, জেলা শহর পয়েন্টে ঘাঘট এবং কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি অব্যাহতভাবে কমছে। গত শনিবার বিকেল ৩টা থেকে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘট নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপত্সীমার পাঁচ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তায় পানি বিপত্সীমার নিচে নেমেছে; যদিও করতোয়া নদীর পানি গত ৯ ঘণ্টায় ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া, শ্রীপুর, হরিপুর, গাইবান্ধা সদরের কামারজানি, ফুলছড়ির কাতলামারী, সিংড়িয়া, কামারপাড়া এবং সাঘাটার গোবিন্দি ও হলদিয়ার কয়েকটি গ্রামের ৩০০ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে গত তিন দিনে। ফলে নতুন করে অনেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। শনিবার প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ায় বানভাসি মানুষ পড়ে চরম দুর্ভোগে।

নওগাঁ : মান্দা উপজেলার জোতবাজার পয়েন্টে আত্রাই নদীর পানি গতকাল বিপত্সীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই পানি বেড়েছে। এরই মধ্যে নদীসংলগ্ন এলাকার সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পানির চাপে আত্রাই ও ফকির্ণি নদীর উভয় তীরের পারনুরুল্লাবাদ বেড়িবাঁধ, বনকুড়া, চকরামপুর, কয়লাবাড়ী, শহরবাড়ী ভাঙ্গিপাড়া, নিখিরাপাড়া, শামুকখোল, লক্ষ্মীরামপুরসহ অন্তত ২০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে শামুকখোল নমঃশূদ্রপাড়া এলাকায় আত্রাই নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। স্থানীয় লোকজন বাঁধটি টিকিয়ে রাখতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছে।  নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আত্রাই নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

নেত্রকোনা : কলমাকান্দার নল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংযোগ সড়ক ভেঙে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে উপজেলার ১৫টি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।

রাজবাড়ী : কয়েক দিন ধরেই দৌলতদিয়া পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে; যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় পানি কমেছে তিন সেন্টিমিটার। গতকাল বিপত্সীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল পদ্মার পানি।

গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ও দেবগ্রামের তিনটি চর এবং কালুখালীর হরিণবাড়িয়া চরের ফসলি জমিসহ নদী তীরবর্তী নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

মুন্সীগঞ্জ : ভাগ্যকূলে পদ্মার পানি গতকাল বিপত্সীমার ২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে সাত সেন্টিমিটার। এতে পদ্মা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলের জনপদগুলোতে আরো পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। চরাঞ্চলের বহু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। দ্রুত পানি আসায় আমন ধানসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মাওয়া পয়েন্টে পদ্মার পানি পাঁচ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় তীব্র স্রোতে হাসাইল-কামারখাড়া সড়কের একটি অংশ ভেঙে গেছে। টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার জানান, রাস্তাটি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা