kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ফল সবজির চালানের সঙ্গে আসছে মাদক

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফল সবজির চালানের সঙ্গে আসছে মাদক

সম্প্রতি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আমভর্তি একটি কার্টনে একটি বড় মাদক চালান চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসবে বলে গোয়েন্দা তথ্য ছিল র‌্যাব সদর দপ্তরের কাছে। এরপর নজরদারি বাড়িয়ে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, আমের খাঁচার ভেতরে করে কোটি টাকার হেরোইনের চালান আনা হবে ঢাকায়। সেই তথ্যে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। একসময় রিকশায় করে আম নিয়ে আসা দুজনকে থামানো হয়। তাঁদের কাছে থাকা আমের কার্টন খুলে ভেতরে পাওয়া যায় একটি প্রেশার কুকার। তার মধ্যে বিশেষ কায়দায় আনা প্রায় কোটি টাকার হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয় হাবিবুর রহমান বাবু ও দিলরুবা দিপা নামে দুই মাদক কারবারিকে।

ওই দুজনসহ সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর কয়েকটি এলাকা থেকে আরো কয়েকটি মাদকের চালানসহ অন্তত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব জানতে পেরেছে, করোনাভাইরাসের সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো মাঠে তেমনভাবে থাকতে না পারার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে তারা। সারা দেশে তাদের শতাধিক সহযোগী রয়েছে। প্রতি মাসে তাদের সহযোগীরা কম করে হলেও অর্ধশতাধিক এমন চালান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কখনো ফলের সঙ্গে, কখনো সবজির ভেতরে আবার কখনো অ্যাম্বুল্যান্সে করে এসব চালান পার করছে তারা। করোনার এই সময়ে খুচরা বিক্রেতারা মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভসের ভেতরে করে অলিগলিতে ঘুরে মাদক বিক্রি করছে।

হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হওয়া হাবিবুর রহমান বাবু ও দিলরুবা দিপা র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তাঁরা রাজধানীর পাশাপাশি ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফল ও সবজির গাড়িতে তাঁরা প্রতি মাসে অন্তত চারটি চালান ঢাকায় নিয়ে আসতেন। শিশুখাদ্য ও মৌসুমি ফল ব্যবসার আড়ালে তাঁরা হেরোইন আনা-নেওয়া করতেন। তাঁদের মতোই অন্য একটি গ্রুপ কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে ‘নট ফর সেল’ লেখা বিভিন্ন সাবানের প্যাকেটেও নিয়মিত ইয়াবা আনছে। সম্প্রতি এই চক্রের জাকির হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব জানতে পেরেছে, তারা নিয়মিত সবজির ও ফলের গাড়িতে মাদকের চালান নিয়ে যাচ্ছে। সাবানের প্যাকেটের পাশাপাশি বিভিন্ন কসমেটিকসের প্যাকেটেও ইয়াবার চালান তারা এক জায়গা থেকে অন্য এলাকায় নিয়ে যায়। গত ১ জুন বিকেলে কারওয়ান বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি কাভার্ড ভ্যানে আসা সবজির ভেতর থেকে ১৫ হাজার ইয়াবা জব্দ করে জাকিরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২-এর পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকি। এই কারবারিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জেনেছে, কক্সবাজার থেকে একটি কাভার্ড ভ্যানের পেছনের দরজার ভেতরে ইয়াবা ঢুকিয়ে ঝালাই করে ঢাকায় আনা হয়। এই ইয়াবার চালানটির মূল মালিক রায়হান নামে একজন। পরে রায়হানকেও সবজির ভেতরে আনা ২০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

অতি সম্প্রতি কুমড়োবোঝাই একটি পিকআপে করে আনা ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের মাদকসহ পিকআপের চালক মারুফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব জানতে পারে, সারা দেশে বিভিন্ন কুমড়াবোঝাই ট্রাকে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক পাচার করছে তাঁরা। তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় পিকআপের ভেতর কুমড়াবোঝাই বস্তায় তল্লাশি চালিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ গাঁজাও উদ্ধার করা হয়।

এ রকম কৌশলে মাদক কারবারের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, এ সময়ে ফাঁকা রাস্তায় মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে মাদক সরবরাহ করছে। তবে র‌্যাবের অভিযানে প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও মাদকের চালান ধরা পড়ছে। কখনো ফলের গাড়িতে আবার কখনো সবজির গাড়িতে আবার দূরপাল্লার বাসগুলো থেকেও ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হচ্ছে। গত ছয় মাসে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে অনেক। তিনি আরো বলেন, করোনাকালীন ছুটিতে সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছেও বেশি মাদক। লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে ১২ জন মাদক কারবারি  ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়।

সারা দেশে ২০১৮ সালের ৪ মে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত গত দুই বছরে কয়েক শ মাদক কারবারি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। এর পরও দেশে থামানো যাচ্ছে না মাদকের কারবার। এখনো সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারসহ পার্শ্ববর্তী আরো কয়েকটি দেশ থেকে সমানে আসছে বড় বড় মাদকের চালান।

কেন মাদক নিয়ন্ত্রণে আসছে না জানতে চাইলে মাদকবিরোধী অভিযান সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা ধরা পড়ছে বা যারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগ মাদকের বাহক বা ছোট কারবারি। এত অভিযানের পরও বড় কারবারিদের বেশির ভাগই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। নাফ নদে রাতের বেলা সাঁতার কেটে ইয়াবা কারবারিরা আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে। আর হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজা ঢুকছে দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে। আম, কাঁঠাল, সবজিসহ জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক ও কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িতে করে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সর্বত্র।

মাঠপর্যায়ে মাদক উদ্ধারে তৎপর থাকা র‌্যাব-পুলিশের অন্তত ২০ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে অভিযানে উদ্ধার হয় দেশে ঢোকা মাদকের মাত্র ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ ফাঁক গলে পৌঁছে যায় যুবসমাজের কাছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা ঠিক যে বিভিন্ন কৌশলে মাদকের বিস্তার ঘটছে। তবে সংঘবদ্ধ চক্রকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। 

সারা দেশে মাদকের নিয়ন্ত্রণ করছে একটি বিশাল সিন্ডিকেট। এর মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কিছু প্রবাসীও রয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদক সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে পুলিশের এক সদস্য ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, লকডাউনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেলেও মাদক কারবারিরা অন্য সময়ের মতোই ব্যস্ত।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া সোহেল রানা বলেন, মাদক নির্মূলে বরাবরই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন কৌশলে মাদক ছড়িয়ে পড়লেও তা নির্মূলে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।

সম্প্রতি বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৮০ কোটি ২৭ লাখ টাকার মাদক ও চোরাচালানসামগ্রী জব্দ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এ প্রসঙ্গে বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার এই সময়ে সীমান্ত এলাকায় মানুষের দেহ তল্লাশি করার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা