kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

কৃত্রিম হ্রদ

শৈলশোভা হ্রদপারে

আলম শাইন   

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শৈলশোভা হ্রদপারে

‘শৈলশোভা হ্রদ’-এর অবস্থান নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন পর্যটন কেন্দ্রের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গের ঢালে। হ্রদটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে ১৯৯৪ সালে। একেবারেই মিয়ানমার সীমান্তের পিঠ ঘেঁষে শুয়ে আছে হ্রদটি। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা বান্দরবান জেলার অন্তর্গত হলেও জেলা সদর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে। দুর্গম পথ! বান্দরবান হয়ে যাওয়া-আসা কঠিনতর। তবে কক্সবাজার থেকে কাছাকাছি; পথ সুগম। দূরত্ব ৩০ কিলোমিটারের মধ্যেই। তাই হয়তো পর্যটকরা এই পথেই বেশি যাতায়াত করে। সেই সুযোগটি নিয়েছিলাম আমরাও। ট্যাক্সিযোগে কক্সবাজারের রামু উপজেলার বাইপাস হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি রওনা হলাম একদিন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রশস্ত রাস্তা পেরিয়ে খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পারের এবড়োখেবড়ো পথ ধরে এগোতে লাগলাম। নদীপারের আঁকাবাঁকা পথ, কোথাও কোথাও খাড়া পার ভেঙে কাঁচা মাটির ঢেলা চিকচিক করছে। আবার কোথাও ঢালু বালিয়াড়ি নদীতে মিশে একাকার হয়েছে। নদীর দুই পারে নলখাগড়া আর পাহাড়ি লতাগুল্মের ছড়াছড়ি। নদীসংলগ্ন ক্ষেতগুলোতে প্রচুর কচু চাষ করেছে পাহাড়িরা। দূর থেকে দেখতে মন্দ লাগেনি তা। আশপাশের চমৎকার সব দৃশ্য উপভোগ করছি আর এগোচ্ছি আমরা। তবে ভয় পেয়েছি উঁচু রাস্তা থেকে নিচের নদীতে নজর দিতেই। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল জলের ঘূর্ণি দেখেই; এই বুঝি ওই ঘূর্ণিতে পড়ে ঘুরপাক খেতে খেতে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলাম। ভয়ে তটস্থ আমরা; তথাপি পাহাড়ি সৌন্দর্যে মোহিত হলাম। জলের ঘূর্ণি, আঁকাবাঁকা পথ আর সামরিক কায়দায় দাঁড়ানো রাবারগাছের সারির ওপর নজর বোলাতে বোলাতে একসময় পৌঁছে গেলাম নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন পর্যটন কেন্দ্রের কাছাকাছি। পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছতেই শুরু হলো বর্ষার বৃষ্টি। সেকি বৃষ্টি! সঙ্গে মেঘের ভয় ধরানো ভীমগর্জন! ভয়ানক গর্জনে আশপাশ প্রকম্পিত হতে লাগল। আশপাশের আকাশজুড়ে বিজলির বিক্ষিপ্ত ছোটাছুটিতে ভয় পেলাম। জীর্ণশীর্ণ কুটিরসদৃশ একটি দোকানে আশ্রয় নিলাম খানিকটা সময়ের জন্য। সে সুবাদে পাহাড়ি কলা আর বনরুটি খেয়ে পেট ভরিয়ে নিলাম। সুস্বাদু সেই কলার স্বাদ আজও মুখে লেপ্টে আছে যেন।

বৃষ্টি থামতেই সোজা শৈলশোভা হ্রদপারে পৌঁছলাম। আহ্ কী চমৎকার হ্রদের দুই ধার! দৃষ্টিনন্দন হরেক প্রজাতির লতাগুল্ম আর উঁচু বড়সড় গাছগাছালির সারি নজরে পড়ল। যেন জলাশয়ের পারেই নৈসর্গিক এক বনানীর সমাহার। জলাশয়ের পাশ ঘেঁষে দৃষ্টি প্রসারিত করে হাঁটতেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা রুই-কাতল, শোল-বোয়ালের দাপাদাপি নজরে এলো। মাছের জলকেলির উৎসবে মুহূর্তেই মন মজে গেল। আগ্রহ বোধ করলাম আরো খানিকটা এগিয়ে যেতে। সামনে এগোতেই বনপ্রান্তরের কাছাকাছি চলে এলাম। কিছু সময়ের জন্য থমকে দাঁড়ালাম পাখপাখালির কুহুতান আর বুনো জানোয়ারের হাঁকডাক কানে ভেসে আসতেই। রোমাঞ্চকর ব্যাপারটা! বেশ লাগছে। তার ওপর পাহাড়ি হ্রদের স্বচ্ছ ও নীলাভ জল দর্শনে মোহিত হয়ে পড়লাম সঙ্গে সঙ্গেই। জল এতটাই স্বচ্ছ ও নীলাভ যে মনে হচ্ছে জলে কোনো ধরনের কেমিক্যাল মেশানো হয়েছে। পারতপক্ষে তা নয়, জল জালিয়াতির মতো ঘটনা ঘটেনি এখানে। প্রকৃতির লীলায় জল ভিন্নরূপ ধারণ করেছে নিজ থেকেই। সে এক ভিন্ন পরিবেশ নাইক্ষ্যংছড়ির শৈলশোভা হ্রদপারের। হ্রদ এলাকাটাকে আরো নয়নাভিরাম করে তুলেছে জলের ওপরের ঝুলন্ত সেতুটি; সেটিও দৃষ্টিনন্দন। তাইতো নিঃসন্দেহে বলা যায় মনোমুগ্ধকর হ্রদ আর বনপাহাড়ের নজরকাড়া দৃশ্যে মোহিত না হয়ে পারবে না পর্যটক। পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা কুমিরের খামার, আর গয়ালের প্রজননকেন্দ্র; যার অবস্থান কাছেপিঠেই। সব মিলিয়ে বলতে হয় শৈলশোভা হ্রদ এক অনন্য দর্শনীয় স্থান।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্য প্রাণী বিশারদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা