kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

ফের সড়কে বিশৃঙ্খলা দুর্ঘটনা বাড়ছেই

► এক মাসের ব্যবধানে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৭৯ শতাংশ
► গতিসীমা না মানা, ফিটনেসহীন গাড়ি বড় কারণ
► বেশি দুর্ঘটনা মোটরসাইকেলে
► বন্ধ থাকায় ৮০ শতাংশ বাস ফিটনেসহীন
► অভিযান বাড়াচ্ছে বিআরটিএ

পার্থ সারথি দাস   

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফের সড়কে বিশৃঙ্খলা দুর্ঘটনা বাড়ছেই

এক মাসের ব্যবধানে সড়কে দুর্ঘটনার হার প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। গ্রামীণ ও আঞ্চলিকের চেয়ে জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার সর্বোচ্চ। ভোর থেকে সকালের মধ্যে দুর্ঘটনার হার ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ১ জুন থেকে দেশে বাস চলাচল শুরুর পর সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। করোনাকালের প্রাণহানি আতঙ্কের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা এ আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬৭ দিন অলস বসে থাকা বাস ও মিনিবাসের বেশির ভাগ চলাচলের উপযুক্ততা হারিয়েছে। এ অবস্থায় ফিটনেস না থাকায় বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ, পুলিশ কর্মকর্তা, গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময় বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও হালকা যানবাহনে যাত্রী পরিবহনে গতিসীমা না মানা, ফিটনেসহীন গাড়ি, বেহাল সড়ক, তদারকির অভাব, অভিযান কম থাকায় সড়কে প্রাণহানির এ ভয়ংকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বসে থাকা বেশির ভাগ বাস চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। কোনোটির ব্রেক নেই, কোনোটির জানালা ভাঙা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে পিষ্ট হয়ে দুই ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্রেক ফেল করায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। বাসের চালক মো. জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বাস ও মিনিবাস নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করেন না মালিকরা। কোনোটির ব্রেক ঠিক নেই, ইঞ্জিন ও ব্যাটারির কার্যকারিতা নেই বললেই চলে, কোনোটির বা চাকা নষ্ট। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শুভংকর ঘোষ (রাকেশ) জানান, তিনিও ৮০ শতাংশ বাস রাস্তায় নামাতে পারেননি। তার পরও পরিবহন শ্রমিকরা পেটের দায়ে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘চালকরা মালিকদের মুনাফা উঠাতে ভাঙাচোরা গাড়িই চালাচ্ছে।’

পরিবহন মালিকরা বলছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সেবা বন্ধ থাকায় তাঁরা লাইাসেন্স নবায়ন ও ফিটনেস করাতে পারেননি। বিআরটিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী মোল্লা কালের কণ্ঠকে জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১ জুন থেকে বিআরটিএর সেবা সীমিতভাবে চালু হয়েছে। মূলত ফিটনেস পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনা বেড়েছে ৭৯ শতাংশ : গত বৃহস্পতিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গত মে মাসে দেশে ২১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯২ জন নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য মতে, গত এপ্রিলে ১১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়। এপ্রিলের চেয়ে মে মাসে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৭৯ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা বেড়েছে গতিসীমা না মেনে চালকরা গাড়ি চালানোয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালনায় গতিসীমা বেশি লঙ্ঘন করা হচ্ছে।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মে মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। ৯৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৮৯ জন, যা মে মাসে মোট নিহতের ৩৩.৪৭ শতাংশ। মহাসড়কে ৪১.৭৮ শতাংশ, আঞ্চলিক মহাসড়কে ৩৮.৯৬ শতাংশ ও গ্রামীণ সড়কে ১৯.২৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভোরে ৭.৫১ শতাংশ, সকালে ২৯.১০ শতাংশ, দুপুরে ২৩.০০ শতাংশ, বিকালে ১৮.৩০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৯.৩৮ শতাংশ ও রাতে ১২.৬৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল মোটরসাইকেল ৪৫.৫৩ শতাংশ, ট্রাক ৩৫.৬৮ শতাংশ, ইজি বাইক-সিএনজি অটোরিকশা ১৬.৪৩ শতাংশ, পিকআপ ১০.৭৯ শতাংশ, কাভার্ড ভ্যান-ট্রলি-ট্রাক্টর ১০.৩২ শতাংশ, কার-মাইক্রোবাস-জিপ ৬.১০ শতাংশ, নছিমন-করিমন-ভটভটি ১১.২৬ শতাংশ ও অন্যান্য যানবাহন ৯.৮৫ শতাংশ।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি গতকাল শুক্রবার গত ঈদুল ফিতরে যাতায়াতকালে ১৯ থেকে ৩১ মে ১৩ দিনে দেশে ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে। গতকাল সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এসংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গণপরিহন বন্ধ থাকায় ঈদ যাত্রা ব্যক্তিগত পরিবহনে সীমিত থাকলেও ঈদের আগে-পরে সড়ক দুর্ঘটনা ছিল অতীতের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় ২৫ মে। ওই দিন ২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়। মোটরসাইকেলে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ২৫ মে। ওই দিন ১৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসের অভাবে পণ্যবাহী পরিবহনে যাত্রী পরিবহনের ফলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েছে। নিষিদ্ধ থাকার পরও রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল যাত্রী পরিবহন করছে। যাত্রী কম থাকায় বেশি লাভের জন্য বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে ঢাকার সড়কেও বাস বেপরোয়া চলাচল করছে। এ জন্য অভিযান জোরদার করতে হবে।’

বিআরটিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী মোল্লা জানান, জেলা প্রশাসন ছাড়াও বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বাড়ানো হচ্ছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা