kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

করোনা সংক্রমণের উপসর্গ

চাঁদপুরে চারজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



চাঁদপুরে চারজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু

দেশে (৯ জেলায়) করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে এক মুক্তিযোদ্ধাসহ আরো ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুরে মারা গেছেন চারজন। আর নরসিংদী ও পাবনায় দুজন করে রয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাতে ও গতকাল বুধবার ছয়জন হাসপাতালে এবং অন্যরা বাড়িতে ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে মৃত ব্যক্তিকে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দাফন করার অভিযোগ উঠেছে। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :

চাঁদপুর : চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দুজনের এবং হাজীগঞ্জ উপজেলায় অন্য দুজনের মৃত্যু হয়। চাঁদপুরে করোনাবিষয়ক ফোকালপার্সন, হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল জানান, আবদুর রাজ্জাক (৭০) নামের এক বৃদ্ধ মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আর লাকী আক্তার (৩৪) নামের এক নারী করোনা উপসর্গ নিয়ে গতকাল সকালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ দুজনের বাড়ি সদর উপজেলার কল্যান্দী এলাকায়। মঙ্গলবার রাতে হাজীগঞ্জ উপজেলায় নিজ বাড়িতে দুজনের মৃত্যু হয় বলে জানান সিভিল সার্জন মো. শাখাওয়াত উল্লাহ। তাঁরা হলেন হাটিলা ইউনিয়নের বালিয়া এলাকার মজিবুর রহমান (৮০) ও হাজীগঞ্জ বাজার এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৭)। তাঁদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃতদের নমুনা সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ নিজ এলাকায় গতকাল দাফন করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসাধীন গতকাল ভোরে মারা যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিউদ্দিন (৭৪)। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সাভারে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. আরশ্বাদ উলাহ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা সফিউদ্দিনের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বন্যা গ্রামে। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ঠাকুরকান্দি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের অধীন সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলায় গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন। ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন আক্তার বলেন, বিকেলে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঠাকুরকান্দি গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শেরপুর : জেলা হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট-ডায়াবেটিস আক্রান্ত এক নারীর করোনাভাইরাস সংক্রমণ সন্দেহে চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শেরপুর শহরের নবীনগরের বাসিন্দা রৌশন আরা বেগম নামে ওই নারীকে (৫১) মঙ্গলবার বিকেলে হাসপাতালে ভর্তির পর রাত আড়াইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে করোনা রোগীদের ওয়ার্ডে রাখা হয়। বারবার বলার পরও কর্তব্যরত চিকিৎসক-নার্সরা রোগীর কাছে যাননি, কোনো চিকিৎসা দেননি। পরে ডায়াবেটিস শূন্য হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সিভিল সার্জন এ কে এম আনওয়ারুর রউফ এবং আরএমও ডা. খায়রুল কবীর সুমন চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, শ্বাসকষ্ট ও ডায়াবেটিস থাকায় তাঁকে আলাদা আইসোলেনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হৃদরোগের সমস্যাসহ মোটা হওয়ায় তাঁর অনেক জটিলতা ছিল। নানা জটিলতায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। শেরপুর সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

নরসিংদী : নরসিংদীতে গতকাল মৃত্যু হয় দুজনের। এর মধ্যে একজন (৩৫) সকালে নরসিংদী ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালের (কোভিড ডেডিকেটেড) আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি অবস্থায় ও আরেকজন (৪০) শহরের ব্রাহ্মন্দী এলাকায় নিজ বাসায় মারা গেছেন। দুজনই এক সপ্তাহ ধরে জ্বর ও ঠাণ্ডায় ভুগছিলেন। হাসপাতালে মৃত ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপও ছিল। পরিবার জানায়, হাসপাতালে মৃত ব্যক্তি নরসিংদী শহরের বাসাইল মহল্লার বাসিন্দা। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। গত মঙ্গলবার তাঁর শ্বাসকষ্ট হলে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ব্রাহ্মন্দীর ব্যক্তি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। গতকাল সকালে তাঁকে তড়িঘড়ি করে রায়পুরা উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এতে তাঁর নমুনা সংগ্রহ করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।

ঝালকাঠি : নলছিটি উপজেলার বৈশাখীয়া গ্রামের বাড়িতে গতকাল সকালে মৃত্যু হয় এক ব্যক্তির (৪০)। তিন দিন ধরে তাঁর বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট ছিল। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন জানান, ওই ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ বুক ব্যথা বেড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ তাঁর নমুনা সংগ্রহ করেছে।

পাবনা ও চাটমোহর : করোনা উপসর্গ নিয়ে পাবনায় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের একজনের বাড়ি সুজানগর ও অন্যজনের বাড়ি চাটমোহর উপজেলায়। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল হোসেন জানান, সুজানগরের সুমন হোসেন (৬৫) গত ১ জুন সর্দি, জ্বর ও কাশির নিয়ে পাবনা হাসপাতালে ভর্তি হন। করোনা উপসর্গ থাকায় তাঁকে সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে আইসোলেশন ইউনিটে রেখে নমুনা সংগ্রহ করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তাঁর রিপোর্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেনি। লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

অন্যদিকে চাটমোহরের আটলংকা নতুনপাড়া গ্রামের জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভোগা নজরুল ইসলাম (৬৫) মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে আনার পর মারা যান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শুয়াইবুর রহমান জানান, পরিবার জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তির অ্যাজমা ছিল। তার পরও সন্দেহজনক হিসেবে তাঁর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সহকারী পুলিশ সুপার (চাটমোহর সার্কেল) সজীব শাহরীন জানান, গতকাল সকালে গ্রামে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সবার নমুনাও সংগ্রহ করা হবে।

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) : জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলার ভাটারা ইউনিয়নের ভেবলা গ্রামে বোনজামাইয়ের বাড়িতে এসে গতকাল ভোরে পোশাক কারখানার শ্রমিক সোলায়মান হোসেনের (৩৭) মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া গ্রামে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সোলায়মান ও তাঁর ভাগিনা কাজল মিয়া নারায়গঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ৩১ মে তিনি জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে নারায়গঞ্জ থেকে পালিয়ে এসে ভেবলা গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করেন। গতকাল তাঁর মৃত্যু হলে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে খবর দিলেও মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী সেখানে পাঠানো হয়নি বলে জানায় এলাকাবাসী। পরিবারের লোকজন স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দুপুরে তাঁর লাশ দাফন করে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গাজী রফিকুল হক বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির বাড়িতে যাওয়ার আগেই জানতে পারলাম লাশ দাফন করেছে পরিবার। বৃহস্পতিবার সকালে স্বাস্থ্যকর্মী গিয়ে মৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা বাড়িটির সবার নমুনা সংগ্রহ করবে। ওই বাড়িসহ কয়েকটি বাড়ির লোকজনকে বাহিরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।’

ভাটারা ইউপির সদস্য বাদল মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ঘটনা চেয়ারম্যানকে জানালে তিনি পরিষদ থেকে কয়েকজন গ্রাম পুলিশ পাঠিয়েছেন। তাঁরা মৃত ব্যক্তির বাড়ির সামনে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে গেছেন, যাতে ওই বাড়িতে বাহিরের কোনো লোক ঢুকতে বা বাহির হতে না পারে।’ ভাটারা ইউপি চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বাদল বলেন, ‘বিষয়টি ইউএনওকে জানিয়েছি। তিনি পরিষদ থেকে গ্রাম পুলিশ পাঠানোর কথা বললে কয়েকজনকে পাঠাই।’

জামালপুর জেলা প্রশাসক মো. এনামুল হক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়, সেটা দেখছি।’

পটুয়াখালী : শহরের থানাপাড়া এলাকার এক বাসিন্দার (৫৬) জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল সকালে মৃত্যু হয়। পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ত্বত্তাবধায়ক ডা. মো. মতিন জানান, মৃত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শিপন বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিকে কভিড-১৯-এর নিয়ম মেনে দাহ করা হয়েছে।’ এলাকাবাসী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ মৃত্যুর খবরে এলাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।’

গৌরনদী (বরিশাল) : গতকাল সকালে গৌরনদী উপজেলার চন্দ্রহার গ্রামে করোনার উপসর্গ নিয়ে নির্মল বৈদ্য (৪০) নামে একজনের মৃত্যু হয়। তিনি তিন দিন আগে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন। তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন। গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান কালের কণ্ঠকে জানান, নির্মল বৈদ্যের নমুনা ১ জুন নেওয়া হয়েছে, তবে এখনো রিপোর্ট আসেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা