kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

ডাব্লিউএইচওর বৈশ্বিক জরিপ

অসংক্রামক রোগীরা চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত

মেহেদী হাসান   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অসংক্রামক রোগীরা চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত

বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার একাধিক অভিযোগ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশেই উঠেছে। নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারির মধ্যে হাসপাতালগুলোতে হৃদেরাগীদের উপস্থিতি কমায় প্রকৃত অর্থেই হৃদেরাগ কমেছে কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল উন্নত কিছু দেশে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এক বৈশ্বিক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, করোনা মহামারির মধ্যে ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক বেশ কিছু রোগের চিকিৎসাসেবা দেশে দেশে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যাহত হয়েছে। অথচ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই মহামারি শুরুর পর থেকে করোনায় গুরুতর অসুস্থ বা মৃত্যু হওয়ার অতিরিক্ত ঝুঁকিতে আছে।

ডাব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ইতালির হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাসে মৃত্যু হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৭ শতাংশের ‘হাইপারটেনশন’ ও ৩১ শতাংশের ‘টাইপ টু’ ডায়াবেটিস ছিল। প্রতিবেশী ভারতের পল্লী এলাকার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জরুরি বিভাগে গত মার্চ মাসে হৃদেরাগীর সংখ্যা আগের বছরের মার্চ মাসের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম ছিল। নেদারল্যান্ডসে ‘লকডাউনের’ কারণে নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। স্পেনে করোনায় গুরুতর আক্রান্তদের ৪৩ শতাংশের ‘কার্ডিওভাস্কুলার’ রোগ ছিল।

বিশ্বের ১৯৪টি দেশে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় কী প্রভাব পড়েছে, তা জানতে গত ১ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত জরিপ চালিয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যে অসংক্রামক অনেক রোগী যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছে না—এমন ক্রমবর্ধমান উদ্বেগজনক তথ্যের পটভূমিতে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে ডাব্লিউএইচও ওই জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপের জন্য ১৫৫টি দেশ তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি দেশের একটি হিসাবে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশের বেশি দেশে ‘রিহ্যাবিলিটেশন’ (পুনর্বাসন) সেবা ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশেরও বেশি দেশি পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে।

‘হাইপারটেনশন’ (উচ্চ রক্তচাপ) ব্যবস্থাপনা ব্যহত হয়েছে ৫২ শতাংশেরও বেশি দেশে এবং প্রায় দুই শতাংশ দেশে পুরোপুরি ব্যহত হয়েছে। ডায়াবেটিস ও এসংক্রান্ত জটিলতার চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ দেশে। এর মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ দেশে পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে। ‘অ্যাজমা’ (হাঁপানি) চিকিৎসাসেবা ব্যহত হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ দেশে। তাদের মধ্যে ২ শতাংশের বেশি দেশে পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে।

‘পেলিয়েটিভ কেয়ারের’ ক্ষেত্রেও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ দেশে। তাদের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ দেশে পেলিয়েটিভ চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে।

করোনা মহামারির মধ্যে দাঁতের জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ দেশে। পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে ১০ শতাংশ দেশে। করোনা মহামারির মধ্যে ৪১ শতাংশেরও বেশি দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যাহত এবং ২ শতাংশেরও বেশি দেশে পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে।

জরুরি কার্ডিওভাস্কুলার (হৃদেরাগ) চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ দেশে। এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে প্রায় ১ শতাংশ দেশে। ডাব্লিউএইচওর ওই জরিপের ফলাফলে কোথাও বাংলাদেশের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে জেনেভায় ডাব্লিউএইচওর তথ্য কর্মকর্তা অ্যালিসন ব্রুনিয়ার গতকাল সোমবার রাতে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, বাংলাদেশও ওই জরিপে অংশ নিয়েছে।

উল্লেখ্য, করোনা মহামারির কারণে গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বহির্বিভাগে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা প্রদানের জন্য সকাল ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত খোলা রাখার আদেশ জারি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৩০ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা নতুন এক আদেশে ৪ এপ্রিলের আদেশ বাতিল করে আগের মতো যথানিয়মে হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাসেবা বঞ্চনার বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।

তবে করোনা মহামারির সময়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার বদলে বিকল্প উপায় যেমন টেলিফোন বা অনলাইনে চিকিৎসাসেবা চালুর বিষয়টিও ডাব্লিউএইচওর জরিপে উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও টেলিমেডিসিন, হটলাইন সেবা চালু আছে। বাংলাদেশ শুধু দেশেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জরুরি চিকিৎসা পরামর্শের জন্যও হটলাইন চালু করেছে।

ডাব্লিউএইচওর জরিপে দেখা গেছে, করোনা মহামারির কারণে ৭৭ শতাংশ দেশে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যাহত হয়েছে। ৬৩ শতাংশ দেশে অ্যাপয়েন্টমেন্টভিত্তিক চিকিৎসাসেবা বন্ধ হওয়ায় রোগী কমেছে। ৪৫ শতাংশ দেশে অসংক্রামক রোগীর সশরীরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হয়েছে। ৪৩ শতাংশ দেশে সরকারি বিধি-নিষেধ, ‘লকডাউনের’ কারণে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে। ৩৮ শতাংশ দেশে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার কর্মীদের করোনাভাইরাস চিকিৎসায় নিয়োগ করা হয়েছে। ৩৪ শতাংশ দেশে হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ৩৩ শতাংশ দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) স্বল্পতার কারণে অসংক্রামক রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়েছে।

ডাব্লিউএইচওর জরিপে দেখা গেছে, করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার হার বেড়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ৭২ শতাংশ তাদের করোনা সাড়াদান পরিকল্পনায় অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও রেখেছিল। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ।

ডাব্লিউএইচওর অসংক্রামক রোগ বিভাগের পরিচালক ড. বেনেট মিকেলসন বলেছেন, করোনা মহামারির সময় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার প্রভাব অসংক্রামক রোগীদের ওপর কতটা পড়েছে, তা জানতে আরো সময় প্রয়োজন।

জরিপ প্রসঙ্গে ডাব্লিউএইচও মহাপরিচালক ড. টেড্রস আডানন ঘেব্রেয়াসাস বলেছেন, ‘বেশ কিছু সপ্তাহ ধরে আমরা বিভিন্ন দেশ থেকে যা শুনে আসছিলাম জরিপের ফলাফলে তাই নিশ্চিত হলো। করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে ক্যান্সার, কার্ডিওভাস্কুলার রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগের চিকিৎসা ও ওষুধ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও  অনেক লোক তা পায়নি। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করাও দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা