kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

লিবিয়ায় পাচারকারীদের হোতা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লিবিয়ায় পাচারকারীদের হোতা গ্রেপ্তার

মানবপাচারকারী হাজি কামাল

লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় মানবপাচারকারীচক্রের অন্যতম হোতা কামাল উদ্দিন ওরফে হাজি কামালকে (৫৫) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গতকাল সোমবার ভোরে র‌্যাব-৩-এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলশান থানার শাহজাদপুর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর কাছ থেকে ৩১টি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। ওই পাসপোর্টগুলোর মালিকদের তিনি লিবিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।

গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ছাড়াও ১১ বাংলাদেশি মারাত্মক আহত হন। এ ঘটনায় মাদারীপুরের রাজৈর থানায় দুটি, মাদারীপুর সদর থানায় একটি ও কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় একটিসহ মোট চারটি মামলা করেছেন নিহতদের অভিভাবকরা। ভৈরবে দায়ের মামলার প্রধান আসামি তানজিরুলের ভাই বাচ্চুকে আটক করেছে পুলিশ। মাদারীপুর সদর থানার মামলার আসামি দিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজৈর থানার ওসি শওকত জাহান জানান, রাজৈর থানায় দুটি মামলায়ই দালাল জুলহাসকে আসামি করা হয়েছে। জুলহাস করোনা পজিটিভ হওয়ায় পুলিশি হেফাজতে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি রয়েছেন। র‌্যাব জানিয়েছে, পাচারকারীচক্রের সদস্যদের তালিকা তারা পেয়েছে। এ ছাড়া কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে তা  লিখে রাখতেন কামাল উদ্দিন। সে তালিকাও পেয়েছে র‌্যাব।

পাচারকারীচক্রের মূল হোতাকে গ্রেপ্তার ও তাঁর অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গতকাল দুপুরে র‌্যাব-৩-এর টিকাটুলী কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন র‌্যাব-৩-এর প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাকিবুল হাসান। তিনি জানান, লিবিয়ায় যে ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে পাঠিয়েছিলেন এই কামাল উদ্দিন। তিনি অবৈধ জেনেও প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় লোক পাঠিয়ে কামিয়েছেন বিপুল অর্থ। তাঁর পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, কামাল উদ্দিন গত ১০ থেকে ১২ বছর সময়ে অবৈধভাবে লিবিয়ায় প্রায় ৪০০ বাংলাদেশিকে পাঠিয়েছেন। লিবিয়া ছাড়াও কামাল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া কামাল একজন টাইল্স কনট্রাক্টর। সে সূত্রে প্রচুর পরিমাণে টাইলস শ্রমিক তাঁর সংস্পর্শে আসে। এ সুযোগে কামাল তাঁদের  প্রলুব্ধ করে বলেন যে তোমরা রোজ ৫ থেকে ৮০০ টাকা আয় করো। লিবিয়াতে গেলে তোমরা প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় করতে পারবে। লিবিয়াতে টাইলস মিস্ত্রিদের অনেক চাহিদা। কামাল আরো বলেন, লিবিয়াতে যাওয়ার আগে মাত্র এক লাখ টাকা আমাকে দিবে এবং বাকি চার লাখ টাকা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পরে তোমাদের পরিবার আমাকে দিবে। এভাবে লোভের ফাঁদে ফেলে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠান তিনি। শ্রমিকরা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য পাচারকারী দলের সদস্যরা তাঁদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবি এবং শারীরিক নির্যাতন করে। সেই নির্যাতনের ভিডিও ভিকটিমদের পরিবারের কাছে পাঠায়। এমনকি সরাসরি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে, যার কারণে ভিকটিমদের পরিবার স্বজনদের জীবন বাঁচানোর জন্য পাচারকারী দলের চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাঠায়। তিনি আরো জানান, এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে র‌্যাব ব্যাপক তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদে কামাল উদ্দিন র‌্যাবকে জানান, প্রথম ধাপে এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে গমনের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। তাদের লোভের ফাঁদের পা দিয়ে বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট কেনাসহ সব কাজও এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা সাত-আট লাখ টাকার বেশি নিয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রথমে সাড়ে চার থেকে ছয় লাখ লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি আড়াই থেকে তিন লাখ লিবিয়ায় যাওয়ার পর ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেয়। র‌্যাব-৩ প্রধান আরো জানান, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে এই চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাঝেমধ্যে এতে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিসর ও লিবিয়ার বেনগাজি-ত্রিপোলি রুট ব্যবহার করে আসছে। দুবাইয়ে পৌঁছে তাঁদের বিদেশি এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে সাত-আট দিন অবস্থান করানো হয়। সেখান থেকে  বেনগাজিতে পাঠানোর জন্য ‘মরাকাপা’ নামের কথিত একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে পাঠায়, যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে ভিকটিমদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর এই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদের মিসর ট্রানজিট দিয়ে লিবিয়ার বেনগাজি পাঠায়। সেখান থেকে বাংলাদেশি এজেন্ট তাঁদের ত্রিপোলিতে স্থানান্তর করে।

লিবিয়া থেকে ইউরোপ পাঠায় যেভাবে : ভিকটিমরা ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি কথিত কয়েকজন এজেন্ট তাঁদের গ্রহণ করে। এ সময় তাঁদের সেখানে কয়েক দিন রাখা হয়। এবং এ চক্রের দেশীয় এজেন্টরা ওই সব ভাগ্য বিড়ম্বিতদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। পরে তাঁদের ত্রিপোলির বন্দর এলাকায় আরেকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সমুদ্রপথ অতিক্রম করার জন্য নৌযান চালনা এবং দিকনির্ণয় যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনিশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হন এবং অসহায় অবস্থায় নির্মম মৃত্যুর শিকার হন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা