kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

► গত ৬ দিনে শনাক্ত ১ হাজার ১১১ জন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শনাক্ত ২৪২৯ জন
► সরকারি তিন হাসপাতালে মোট শয্যা রয়েছে ২২৮টি, কোনোটিতে শয্যা খালি নেই
► উদ্বোধনের এক সপ্তাহ পরও রোগী ভর্তি করছে না বেসরকারি হাসপাতাল

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়ছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর। এ অবস্থায় আগামীকাল রবিবার থেকে ‘সীমিত আকারে’ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান খোলা ও গণপরিবহন চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সব মিলিয়ে এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে সেটা বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সব মহলের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলার উপজেলাগুলোতে সর্বশেষ গত ছয় দিনে এক হাজার ১১১ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট শনাক্ত রোগী দুই হাজার ৪২৯ জন। বৃহস্পতিবার এক দিনেই সর্বোচ্চ ২২৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫-৮০ শতাংশ নগরের বাসিন্দা। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৬৮ জন। তাদের অধিকাংশই নগরের বাসিন্দা। সর্বাধিক শনাক্তের তালিকায় ঢাকা নগরের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রামে যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে তাতে বোঝা যায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। তাঁরা বলছেন, এখন লকডাউনের মধ্যেই চট্টগ্রামে লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা রোগী বাড়ছে। যখন সব কিছু খুলবে, গণপরিবহন চলবে তখন সংক্রমণ তো আরো ব্যাপক হতে পারে।

গত কয়েক দিনে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুজন সহকারী পরিচালক, বিআইটিআইডি ল্যাবের প্রধানসহ চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বেশ কিছু চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার এক নবজাতক শিশুরও করোনা ধরা পড়েছে। এ ছাড়া শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পুলিশ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও আক্রান্ত হয়েছে।

বিআইটিআইডি ল্যাবের প্রধানসহ পাঁচজন আক্রান্তের পর ল্যাবটি গতকাল থেকে রবিবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

করোনা আক্রান্ত চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় রোগী প্রতিদিনই বাড়ছে। অপ্রয়োজনে চলাফেরা, যাতায়াতের কারণে সংক্রমণ বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, এরই মধ্যে কাস্টম হাউসের ২১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। রবিবার থেকে সীমিত পরিসরে অফিস খোলার পর লোকজনের অবাধ যাতায়াতে আক্রান্ত অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলবে?

এমন উদ্বেগ সরকারি-বেসরকারি-স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজনীতিক, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ী নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে যেভাবে চট্টগ্রামে লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা রোগী বেড়েছে, রবিবার থেকে সব সচল হলে সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ যে আরো বেড়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে যারা গ্রামের বাড়ি গেছে তারা আবার নগরে আসতে শুরু করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রযোজনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন চট্টগ্রামে আসবে। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব না মানলে করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতি যতই অবনতির দিকে যাচ্ছে ততই সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংকট প্রকট হচ্ছে। নগর ও জেলার তিনটি সরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি নেই। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বেসরকারি হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালটি উদ্বোধন করার এক সপ্তাহ পরও রোগী ভর্তি শুরু হয়নি। এ ছাড়া নতুন করে আরো তিনটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কভিড-১৯ চিকিৎসাসেবা চালুর কথা বলা হলেও সেগুলোতে কখন রোগী ভর্তি করা হবে তা কেউ বলতে পারছে না।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আব্দুর রব গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। ১০টি আইসিইউতে ১০ জন ভর্তি আছে। আর আইসোলেশনে ১২৪ জন ভর্তি আছে।’ তিনি জানান, চিকিৎসাধীনদের মধ্যে সুস্থ হয়ে চলে গেলে প্রতিদিন আট-দশজন নতুন রোগী ভর্তি হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের (বিআইটিআইডি) এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, গত দুই দিন শয্যা খালি না থাকায় নুতন রোগী ভর্তি করা যায়নি। গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত কভিড ইউনিটে ১৮টি শয্যার (পুরুষ) সব কটিতে রোগী ছিল। দুপুরের পর ছাড়পত্র নিয়ে আটজন বাসায় গেলে নতুন রোগী ভর্তি করা হবে। হাসপাতালে ৩০টি শয্যা আছে।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত সপ্তাহে ৬০ শয্যার করোনা ইউনিট চালুর পরপরই রোগীর চাপ তৈরি হয়। গতকাল দুপুর পর্যন্ত ওই ইউনিটে ৫৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে দুজন রোগী মারা গেছে। শয্যা কম থাকার কারণে কয়েকজন (চিকিৎসক ও নার্সিং কর্মকর্তা) হাসপাতালের ২৯ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া হাসপাতালের ২৫ শয্যার ফ্লু কর্নার ও অবজারভেশন সেলে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ৮৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। অধিকাংশ রোগী শয্যার অভাবে সেলের ভেতরে-বাইরে (বারান্দায়) মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে রয়েছে। ওই সেলের কারো করোনা ধরা পড়লে তাকে করোনা ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।

নগরের দামপাড়া এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোহাম্মদ আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ছোট বোনকে (বয়স ৪০) জ্বর, ব্যথা ও হালকা শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ভর্তি করাতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিয়ে যাই। ফ্লু কর্নারে ভর্তি দেওয়ার পর সেখানে গিয়ে দেখি বারান্দায়ও প্রচুর রোগী। সেখানকার স্টাফরা বললেন, শয্যা খালি নেই, মাদুর (চাটাই) কিনের আনুন, মেঝেতে থাকতে হবে। এ অবস্থা দেখে আমার বোনকে বাসায় নিয়ে এসেছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা