kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

আম্ফানের তাণ্ডব

দুর্বল বাঁধ রক্ষা করতে পারেনি কোনো ফসল

► শত শত বিঘা জমির পাকা ধান নিমিষেই তলিয়ে গেছে
► রাজশাহীতে ঝরে গেছে ৪০% আমন
► দিনাজপুরে তিন শ হেক্টর জমির লিচু নষ্ট

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্বল বাঁধ রক্ষা করতে পারেনি কোনো ফসল

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাত এখনো সামলে উঠতে পারেননি দেশের উপকূল অঞ্চলের মানুষ। তাঁরা বলছেন, ফল-ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা তাঁদের পক্ষে খুবই কঠিন। উপকূলের বাসিন্দারা বরাবরই বলছেন, যত দিন টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হবে, তত দিন আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে ফল-ফসল রক্ষা করা যাবে না। কালের কণ্ঠ’র আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিদের খবরে বিস্তারিত—

খুলনা : আম্ফানের ধাক্কায় খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার অনেক জায়গায় নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এত জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে অনেক এলাকা। কয়রা সদর, মহারাজপুর, দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন ও পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা এখনো পানির নিচে। স্থানীয়রা বলছেন, বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে না পারলে এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। বাড়তে থাকবে সম্পদ ও ফসলহানি। এ কারণে এলাকার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করে যাচ্ছেন।

পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নের কালীনগর গ্রামের বাওয়ালি বাড়ির সামনের বাঁধ ভেঙেছে চার জায়গায়। এলাকার প্রায় সব মানুষ জড়ো হয়ে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করছেন। ভাটির সময় কাজ করেন, কিন্তু জোয়ারে তা ভেঙে যায়। এভাবে চারবার ভেঙেছে। কাজ তদারক করছেন রাজ্জাক মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানকার ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভিটের ওপর দুই-তিন ফুট পানি। এই বাঁধ টেকাতে না পারলে আমরা ডুবে যাব।’

কয়রা উপজেলা সদরও পানির তলায়। অদূরের কপোতাক্ষ পারের হরিণখোলা-কাটাখালী ২ নম্বর কয়রা বাঁধের আড়াই কিলোমিটার একেবারে বিধ্বস্ত। এর মধ্যে সাতটি জায়গা ভেঙে গেছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করে ছয়টি ভাঙন মেরামত করেছেন।

সাতক্ষীরা : আম্ফানের প্রভাবে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ভেঙে যাওয়া ৭৭টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ সংস্কারে স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্বীপ এলাকার ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ৪৭টি পয়েন্ট সাময়িকভাবে সংস্কার করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বিভাগের আওতায় ৮০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সব সময় ঝুঁকিতে থাকে। আম্ফানে সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনির শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েকটি স্পটে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউলখোলা এলাকার বেড়িবাঁধের। এ ছাড়া আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রকাটি, কুড়িকাউনিয়া, চাকলা, হিজলা, দিঘলাররাইট ও কোলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে।

জয়পুরহাট : আম্ফানের পর ভারি বৃষ্টিপাতে জেলা সদর, ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে হেলে পড়া শত শত বিঘা জমির পাকা ধান ডুবে গেছে পানিতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটে এ বছর বোরো চাষ হয়েছে ৬৯ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে। জয়পুরহাট সদর উপজেলার হিচমি, কোমরগ্রাম ও বানিয়াপাড়া, ক্ষেতলাল উপজেলার তিলাবদুল, মালিপাড়া এবং কালাই উপজেলার চকলয়াপাড়া, করিমপুর ও বামনগ্রাম মাঠে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় জমির ধানই পানির নিচে। সদর উপজেলার হিচমি গ্রামের কৃষক ফজলু মিয়া জানান, তাঁর তিন বিঘা জমির বোরো ধান পানিতে ডুবে যায়। অনেক কষ্টে সেগুলো কাটার পর ধান পেয়েছেন মাত্র ৩০ মণ। ধান কাটতে মজুরদের দিতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা।

মাগুরা : আম্ফানের আঘাতে মাগুরায় বিভিন্ন ফসলের প্রায় ২৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আট হাজার ১৩৬। আম্ফানের পর এক সপ্তাহ ধরে এ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক জাহিদুল আমিন জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমের। জেলার সদর, শ্রীপুর, শালিখা ও মহম্মদপুর—এই চার উপজেলায় আম্ফানে ছয় কোটি ৪৬ লাখ টাকার আম নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির তালিকায় আমের পর রয়েছে পেঁপে। জেলার চারটি উপজেলায় চার কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার টাকার পেঁপে নষ্ট হয়েছে। কলা চাষে ক্ষতি হয়েছে চার কোটি পাঁচ লাখ ৬০ হাজার টাকার।

রাজবাড়ী : বালিয়াকান্দিতে ধান পানিতে ডুবে গেছে। কাটতে না পেরে কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ধান চাষি রুস্তম শিকদার, আজিজ মণ্ডল, মান্নান শেখ ও নাছির শেখ জানান, উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বারুগ্রাম, নতুনচর, বারিকগ্রাম, বাঘুটিয়া ও পাটুরিয়া এবং জামালপুর ইউনিয়নের তুলশী বরাট, মাশালিয়া, লক্ষণদিয়া, কুমোদদিয়া, নটাপাড়া ও গোবিন্দপুর এলাকায় বোরো ধানের আবাদ বেশি হয়। ঝড়ের কারণে ধান মাটিতে নুইয়ে পড়েছে।

রাজশাহী : ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে রাজশাহীতে অন্তত ৪০ শতাংশ আম ঝরে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের দিন থেকে শুরু করে গত কয়েক দিন ধরেই আম ঝরে পড়ছে। তার পরও বাজারে আসতে শুরু করা আম নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন বিপত্তি। করোনা আতঙ্কে বাজারে তেমন ক্রেতা না থাকার কারণে আম চাষিরা বাগান থেকে আম পাড়ার সাহস পাচ্ছেন না। আবার যেসব চাষি আম বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরাও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। বৃহস্পতিবার বিকেলে বানেশ্বর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা এক শ জনের মতো। তাঁদের মধ্যে বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি। কেনার লোক হাতে গোনা ছয় থেকে সাতজন। সেখানে প্রতি মণ গোপালভোগ আম বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকায়। গুটি বা আঁটি জাতের প্রতি মণ আমের দাম ছিল ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা।

দিনাজপুর : আম্ফান ও কয়েক দফা বৈশাখী ঝড়ে দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লিচু চাষিরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরে এবার সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিনাজপুর সদর, বিরল ও চিরিরবন্দর উপজেলায়।

রামপাল : আম্ফানের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের রোমজাইপুর গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষ ১০ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছেন। ভেসে গেছে অনেক চিংড়ি ঘের। ভেঙে গেছে এলাকার রাস্তাঘাট।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা