kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

সাক্ষাৎকার

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই অগ্রাধিকার

► শক্তিশালী করা হবে বন্ড মার্কেট
► শিগগির পুঁজিবাজারে আসবে রবি, আনা হবে বিকাশকেও
► বিনিয়োগকারীর স্বার্থ দেখে তবেই আইপিও

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই অগ্রাধিকার

ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম, চেয়ারম্যান, বিএসইসি

অর্থনীতির এক টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।

করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কায় যখন পর্যুদস্ত পুঁজিবাজার, শেয়ার ছেড়ে মূলধন উত্তোলনে দুর্বল আইপিও, আস্থার সংকট ও সুশাসনের অভাব নিয়ে যেখানে রয়েছে দীর্ঘ আলোচনা, সেখানে এসব পরিস্থিতির মধ্যে নতুন দায়িত্ব নিয়ে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ড. শিবলী জানিয়েছেন তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার রফিকুল ইসলাম

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে ড. শিবলীর লক্ষ্য গতিশীল বন্ড মার্কেট নিশ্চিত করা, ভালো শেয়ারের জোগান দিয়ে বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করা, বিনিয়োগের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। বর্তমান ইক্যুইটিনির্ভর পুঁজিবাজারে গভর্ন্যান্স নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়াও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

বন্ড মার্কেটে গতি আনা : সত্যিকার অর্থে অর্থনীতিতে দুইটা মার্কেট। মানি মার্কেট ও ক্যাপিটাল মার্কেট। মানি মার্কেট চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর পুঁজিবাজার চালায় বিএসইসি। মানি মার্কেটের ভূমিকা—সে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে মানুষকে ঋণ দেবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য আমদানি-রপ্তানি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেবে। যেমন বেতন-ভাতা, গাড়ি কেনার জন্য ঋণ দেবে। পুঁজি—এটা দিয়ে বিল্ডিং, মেশিনারিজ কিনবে। পৃথিবীর কোথাও ব্যাংকিং খাত দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজি দেয় না। পুঁজি সরবরাহ করে ক্যাপিটাল মার্কেট। ক্যাপিটাল মার্কেটের চরিত্র অনেক। তবে আমরা শুধু ইক্যুইটিনির্ভর। আরো অনেক কিছু করার আছে।

পুঁজির সরবরাহ হয় মূলত বন্ডে। স্বল্প মেয়াদে কোনো কম্পানি বন্ড ইস্যু করবে। আমরা অনুমতি দেব। বাজার থেকে ২০ বা ৫০ কোটি টাকা তুলবে। পাঁচ বছরে মানুষ সেই টাকা সুদসহ শোধ দেবে। এখন ব্যাংকে সুদ ছয় শতাংশ। যারা অবসরে গেছেন, সঞ্চয়ের ওপর যাঁরা চলেন, তাঁরা এখন বেশ অসুবিধায় আছেন। ৮ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফা পেলে তারা বন্ড কিনবেন। বন্ড মার্কেটে টাকা আসবে। আর সেই টাকাই ব্যবসায়ীরা নেবেন, ব্যবসা করবেন। ব্যাংকের পেছনে আর দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। বন্ড মার্কেট গতিশীল করতে পারলেই ক্যাপিটাল মার্কেট শক্তিশালী হবে। সেই সঙ্গে ডেরিভেটিভস নিয়ে কাজ করা যায়। তারপর আস্তে আস্তে ফরওয়ার্ড মার্কেট ও ফিউচার মার্কেট নিয়ে কাজ শুরু করব। পুঁজিবাজারকে গভর্ন্যান্সের মধ্যে আনা হবে।

বন্ডে চাহিদা ও জোগানের সমস্যা : এফডিআরে সুদহার অনেক বেশি ছিল, যার কারণে অনেকে পুঁজিবাজারে আসেনি। এখন এফডিআরে সুদহার ছয় শতাংশ করা হয়েছে। কাজেই বন্ডের চাহিদার জায়গা বাড়বে। মানুষের ফিক্সড রিটার্নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কেউ বন্ডে আট থেকে সাড়ে আট শতাংশ সুদহার পেলে সে কেন ছয় শতাংশে যাবে! আবার ৯ শতাংশে ঋণ নিতে হয়। তবে বন্ডের মাধ্যমে আট শতাংশে পুঁজিবাজার থেকে টাকা পেলে বন্ড ছাড়তে আগ্রহী হবে। বন্ড ইস্যুয়ার ও বিনিয়োগকারী উভয়ই লাভবান হবে।

আইপিও : পুঁজিবাজারে ভালো ভালো কম্পানির আইপিও দেব। মোবাইল ফোন অপারেটর রবি শিগগিরই বাজারে আসবে। বিকাশের মতো কম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আনা হবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বিএসইসির কথা ও সার্টিফিকেশনের ওপর কম্পানিকে টাকা দেবে। খারাপ কম্পানিকে আইপিও দেব না, যা দু-চার বছর পর বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন—এমন কিছুই করব না। বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, নিশ্চিত হয়ে আইপিও দেওয়া হবে। দেখে দেখে আইপিও দেব। আইপিওর কারণে বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেব না।

বাজার মূলধন : পুঁজিবাজারে ভালো ভালো কম্পানি এলে বাজারে টাকাও আসবে। বন্ডের মাধ্যমে বাজারে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে আসব। বন্ডে বিনিয়োগ খুব উপকারী। বন্ড মার্কেট উন্নত করে ইক্যুইটি মার্কেটকে গভর্ন্যান্সের মধ্যে আনতে পারলে পুঁজিবাজারকে ভালো অবস্থানে নেওয়া সম্ভব। আমি যেটা করব, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসব। আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে বড় বড় বিনিয়োগ ও নামকরা বিনিয়োগপ্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আনব। বহুজাতিক কম্পানি আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিছু কিছু সরকারি ভালো কম্পানি, বহুজাতিক কম্পানি—যেগুলো ওষুধ ও সিমেন্ট খাতে রয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে নিজে কথা বলব। বিদেশি কম্পানি পুঁজিবাজারে আনার ক্ষেত্রে সহায়ক সব কিছু করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আস্থার সংকট : বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবে, বাজার ভালো হচ্ছে, তখন আবার আসবে। ঈদের পর বাজার খুলে দিলে দেখবেন, তারা ধীরে ধীরে আসছে। বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে সুন্দর পরিবেশের অপেক্ষায় আছে। যদি তারা নিশ্চিত হয় যে তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ, রিটার্ন আসবে বা সেকেন্ডারি মার্কেট ভাইব্রান্ট হবে, তখন বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরবে। কারণ তারা চায় ভালো একটা পরিবেশ, ভালো রিটার্ন। সেটা আমরা যতটা সম্ভব নিশ্চিত করব।

রিটেইল ইনভেস্টর : (বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রসঙ্গে) সরকার মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে কিছু নীতিমালা করছে। মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভালো মানের কম্পানি পেলে আমরাও ফান্ডের অনুমতি দেব। পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের উৎসাহিত করব যেন ভালো ফান্ডের ব্যবস্থা করে। এই মার্কেটে মানুষের বিনিয়োগ জ্ঞান খুব কম। যেহেতু জ্ঞান কম, তাই মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসা ভালো। তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমরা নিজে ফান্ড ম্যানেজারদের সঙ্গে যোগাযোগ করব। লোক পাঠিয়ে নয়, আমি নিজে গিয়েও তাদের সঙ্গে কাজ করব। সবাই মিলে একটা সুন্দর ও বিনিয়োগযোগ্য পুঁজিবাজার গড়ে তুলব।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা