kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

কাগজে-কলমেই নিষেধাজ্ঞা ঢাকা ছাড়ার ঢল

এস এম আজাদ ও রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাগজে-কলমেই নিষেধাজ্ঞা  ঢাকা ছাড়ার ঢল

রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়ানো বেশ কিছু মোটরসাইকেল। কাছে যেতেই চালকদের কয়েকজন জানতে চাইলেন, ‘কোথায় যাবেন? কোন জেলায়!’ দুই হাজার টাকায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর যাচ্ছিলেন সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। বললেন, ‘ভাই, জরুরি কাজে ঢাকায় আটকে গেছি। এই মৃত্যুপুরীর মধ্যে থাকা কি ঠিক? যা হোক, যেমনে পারি তাই চলে যাচ্ছি!’

গতকাল ঢাকার গাবতলী, কারওয়ান বাজার, গুলিস্তান, মহাখালী  ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে এভাবেই লোকজনকে দল বেঁধে প্রাইভেট কার, অটোরিকশা, পিকআপ, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঢাকা থেকে পুলিশের  চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে অবাধে বের হয়ে যেতে দেখা গেছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন এভাবে সামাজিক দূরত্ব না মেনে, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে মানুষ।

পরিবহন ও ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার কাছাকাছি গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকায় মানুষজন যাওয়া-আসা করছে বেশি। ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন যানবাহনে করে গন্তব্যে যাচ্ছে তারা। অনেকে মোটরসাইকেলেও যাতায়াত করছে। তবে কাউকে স্বাস্থ্যবিধি  মেনে দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে না।

অথচ করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দেড় মাস আগে ঢাকায় প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণে রাখার  ঘোষণা দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে ওই  ঘোষণা এখন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

এ পরিস্থতির বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে মানুষের শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। পরিস্থিতি অবনতিশীল।’ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে গতকাল শনিবার তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, করোনা মহামারিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা। ঢাকা ও আশপাশের জেলায়ই প্রায় ৯০ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুর হারও বেশি এখানে। এ কারণে সরকার ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতেও কাউকে না যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। ঢাকা থেকে লোকজন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গেলে করোনা মহামারি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রথম দিকে কড়াকড়ি থাকলেও এখন সড়কে নেই তেমন তল্লাশি। ছোট যানবাহনে, জরুরি কাজ এবং অল্প পথে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে মানুষ দূরের জেলায় চলে যাচ্ছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ঠেকাতে নেই পদক্ষেপ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ থেকে বাস, লঞ্চ,  ট্রেনসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ আছে। ঢাকার চারটি প্রবেশপথে ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি করছে পুলিশ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ যাতে ঢাকায় প্রবেশ ও ঢাকা থেকে বের হতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রয়েছে। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঝুঁকি নিয়ে মালবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুল্যান্স, পিকআপ ভ্যান ও মোটরবাইকে করে দূর-দূরান্তের জেলায় বাড়ি ফিরছেন অনেকে। চেকপোস্টে পুলিশ তল্লাশি করলেও নানা অজুহাত দিচ্ছে লোকজন।

কারওয়ান বাজার গিয়ে দেখা  গেছে, রাতে যেসব ট্রাক সবজি ও মাছ নিয়ে আসে, সকালে ফিরতি সেসব ট্রাকে গাদাগাদি করে গ্রামে যাচ্ছে মানুষ। আব্দুর রহিম নামে একজন এ পদ্ধতিতে যাবেন বলে একটি ট্রাকের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। বগুড়ায় যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে ভাড়া চাওয়া হয়েছে ৭০০ টাকা।

গতকাল ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ আব্দুল্লাহপুরে গিয়ে বাইকের পাশাপাশি অনেককে ট্রাকে চেপেও ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। রফিক মিয়া নামের এক ব্যক্তি ৫০০ টাকায় যাচ্ছিলেন মানিকগঞ্জ। কেউ কেউ রাজশাহী, কুষ্টিয়া, নাটোর, সাতক্ষীরা ও রংপুরেও যাচ্ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই জানা গেল, তারা পরিবহন বদল করে ট্রাক, অ্যাম্বুল্যান্স, লেগুনা ও আটোরিকশায় করে শত শত মাইল দূরের জেলায় পাড়ি দিচ্ছে।

ট্রাকচালক সোহরাব আলী বলেন, ‘নাটোর থেকে কাঁচা সবজি নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, ফেরার সময় মানুষ ভর্তি করে ফিরছি। এতে কিছু টাকা ইনকাম হলো। মানুষেরও উপকার হলো।’ ঝুঁকির কথা জানালে তিনি বলেন, ‘ভাই আমি না নেই, অন্য কেউ নেবে। মানুষ তো যাইতেছে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রবেশের সব পথই উন্মুক্ত রয়েছে। অবাধে মানুষ ও যানবাহন ঢুকছে,  বের হচ্ছে। পুলিশের তল্লাশিতে কঠোরতা নেই। আমিনবাজার সেতু, কাঁচপুর সেতু, পোস্তগোলা সেতু, বাবুবাজার সেতু, বছিলা সেতু, বিরুলিয়া সেতু, টঙ্গী সেতু, কাঞ্চন সেতু ও ডেমরা সেতুতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। এসব চেকপোস্টে আগে কড়াকড়ি থাকলেও এখন তেমন নেই। এ ছাড়া ঢাকায়  ঢোকার অন্য প্রবেশপথগুলোর মধ্যে বছিলার শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুতেও গত মাসে পুলিশের কড়া পাহারা ও ব্যারিকেড ছিল। যার কারণে ঢাকায় প্রবেশ কিংবা বের হতে প্রত্যেককে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো, তবে এখন আর কঠোর নজরদারি নেই।

গাবতলী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান ও অ্যাম্বুল্যান্সে করে আরিচা ঘাটে যাচ্ছে সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা, মেহেরপুরসহ কিছু জেলার মানুষ। সেখান   থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে বলে জানায় তারা। মোবারক নামে এক যুবক ৬০০ টাকা ভাড়ায় পিকআপ ভ্যানে ঝিনাইদহে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন বলে জানালেন।

গুলিস্তান থেকেও মাওয়া ঘাটে যাচ্ছে পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল ও অ্যাম্বুল্যান্স। ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশাল অঞ্চলের মানুষ সেখান থেকে ট্রলারে পদ্মা পার হয়ে বাড়ি যাচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্ত জেলা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চেকপোস্ট বসিয়ে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর পরও নানা অজুহাতে মানুষ বের হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে নাগরিকদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

‘লকডাউনের’ মধ্যেও লঞ্চ ও ফেরিঘাটে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নেমেছে। গতকাল সকাল থেকে ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটে কমপক্ষে ৫০০ যানবাহন চোখে পড়ে। প্রতিটি যানবাহনেই সামাজিক দূরত্ব না মেনে মানুষ গাদাগাদি করে বসে বা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল।

মুন্সীগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) নাজমুর রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার দিক থেকে বেশিসংখ্যক গাড়িতে লোকজন আসছে ঘাটে। এতে ঘাটে গাড়ির জট লেগে থাকছে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য কম হওয়ায় সামলাতে হিমশিম  খেতে হচ্ছে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের শিমুলিয়া ঘাটের উপ-মহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে ১৩টি ফেরি চলছে। এর পরও যানবাহন পারাপারে হিমশিম   খেতে হচ্ছে ঘাট কর্তৃপক্ষকে। পুলিশ অনেক গাড়ি ঢাকার দিকে ফেরত পাঠালেও শিমুলিয়া ঘাটে গাড়ির অনেক চাপ। ঘাটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৬০-৭০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা দরকার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা