kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

করোনাযোদ্ধা

তবু তাঁরা বিরামহীন

৮ নারী ইউএনও-এসি ল্যান্ড করোনাযুদ্ধে

বিশ্বজিৎ পাল বাবু ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৬ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তবু তাঁরা বিরামহীন

ঘর থেকে এক রকম চোরের মতো বের হয়ে পড়ি। কখন না আবার ছোট ছেলেটা (দুই বছর বয়স) পিছু নেয়। রাতে এসেও ওকে কোলে নিতে পারি না। ফেরার পর একটু ভালোভাবে ফ্রেশ হতে হতে হয়তো ছেলেটা ঘুমিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

কথাগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা আশরাফীর। জেলার কসবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাসিবা খানের মেয়ে আনাবিয়া-নূরের বয়স সাড়ে সাত মাস। মা ঘরে এলেই ছুটে এসে কোলে উঠতে চায় ছোট্ট ওই শিশু। কিন্তু নিজেকে ভালোভাবে ‘তৈরি’ না করে প্রিয় সন্তানকে কোলে না নিতে পারার যন্ত্রণায় প্রতিদিনই ক্লিষ্ট হন দুজনই। নাজমা আশরাফী, হাসিবা খানরা করোনাযোদ্ধা। তাঁদেরই সহকর্মী বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহের নিগার। তিনি সন্তানসম্ভবা। কিন্তু থেমে থাকার সুযোগ নেই তাঁরও। করোনা পরিস্থিতিতে ছুটে চলতে হচ্ছে দিন-রাত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৯ উপজেলায় ইউএনও হিসেবে তিনজন ও এসি ল্যান্ড হিসেবে পাঁচজন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে নাসিরনগর উপজেলায় ইউএনও ও এসি ল্যান্ড এই দুই পদেই কর্মরত আছেন নারীরা। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন থাকা বিজয়নগর উপজেলা ও জেলার করোনা ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত আখাউড়া উপজেলাও সামাল দিচ্ছেন নারী ইউএনও। করোনা পরিস্থিতিতে তাঁরা ছুটে চলছেন দিন-রাত। ঘরে, গর্ভে সন্তান নিয়েই তাঁদের অবিরাম ছুটে চলা। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা কাজ করে চলছেন। এই আট নারী করোনাযোদ্ধার সঙ্গে কথা হলে প্রত্যেকেই দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। জানালেন, দায়িত্ববোধ থেকেই নির্ধারিত কাজের বাইরেও অনেক কিছু করে যাচ্ছেন জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে। ভালো একটা দিনের প্রত্যাশায় আছেন তাঁরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খাঁন সার্বিক পরিস্থিতিতে নারী কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করেছেন। শুক্রবার দুপুরে কথা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য গর্বের যে তাঁরা যোগ্যতার পরিচয় রেখে দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারির সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। ত্রাণ বিতরণ থেকে শুরু করে হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বাজার মনিটরিংসহ সব কাজেই সর্বোচ্চ পরিশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায় ছাড়াও জেলা পর্যায়ে কর্মরত নারী কর্মকর্তা এডিএম মিতু মরিয়ম, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুনু সাহা, তনিমা আফ্রাদ, সাফফাত আরা সাইদ করোনা পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাজে সবাই খুশি। ’

সকাল সোয়া ১১টায় কথা হলো আখাউড়ার ইউএনও তাহমিনা আক্তার রেইনার সঙ্গে। জানালেন, করোনাসংক্রান্ত কাজেই বের হয়েছেন। এখন আর সময় ধরে কিছু করা যায় না। সাতসকালে যেমন বের হতে হয় তেমনি ফিরতে অনেক রাত হয়। নাসিরনগরের ইউএনও নাজমা আশরাফী বললেন, ‘সকাল থেকে দাপ্তরিক তিনটি কাজ শেষ করেছি। এখন ঘরের চিন্তা করতে হচ্ছে। তবে বেসরকারি চাকুরে স্বামীকে কাছে পাওয়ায় এখন তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। এ ছাড়া বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে আমি মানসিকভাবে বেশ সাপোর্ট পাচ্ছি। চিন্তা করার সময় পাই না যে আমি একজন নারী। বরং নারী বলেই আমি সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারি, যেটা পুরুষ কর্মকর্তার বেলায় বাধ্যবাধকতা থাকে। ’

ছয় বছরের ছেলেসন্তানের জননী বিজয়নগরের ইউএনও মেহের নিগার এখন সন্তানসম্ভবা। পরিস্থিতি কিভাবে সামলান জানতে চাইলে বলেন, ‘প্রশিক্ষণে আমাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া হয়। ’ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি চাইলে ছুটি নিতে পারতাম। তাহলে আমি বিবেকের কাছে হেরে যেতাম। আবার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কাছ থেকেই কাজের স্পৃহা পেয়েছি। ’

আশুগঞ্জের এসি ল্যান্ড ফিরোজা পারভীনের স্বামীও একজন করোনাযোদ্ধা। লন্ডনে তিনি চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে ও ১৪ মাসের ছেলে সন্তানের জননী ফিরোজা বলেন, ‘এখন তো পরিবারের চিন্তা করলে হবে না। মহামারির এই সময়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। সব কিছুতেই এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ’ সরাইলের অ্যাসি ল্যান্ড ফারজানা প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘দায়িত্ব পালনে নারী পুরুষ বলতে কোনো কথা নেই। জেলা প্রশাসক মহোদয় যেভাবে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। যতটুকু সতর্ক থেকে কাজ করা যায় সেটা মেনটেইন করছি। ’

পাঁচ বছরের ছেলে ও দেড় বছরের মেয়ে সন্তানের জননী নাসিরনগরের এসি ল্যান্ড তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘কাজ করতে গিয়ে ভয় তো আছেই। এখন অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ঘরে এলে ছেলে-মেয়েরাই বলে যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি ঠিক রাখি। ’

নাফিসা নাজ নীরার একমাত্র কন্যাসন্তান নাবিহা নাওয়ারের বয়স এক বছর ১০ দিন। ছোট্ট এই শিশুটিকে ঘরে রেখেই ছুটতে হয় জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় কর্মরত এসি ল্যান্ড নাফিসাকে। বলেন, ‘দায়িত্ব ভেবেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ’ তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি ডাইরেক্টর পদে কর্মরত স্বামী সঙ্গে আছেন বলে সংসারের দিক থেকে বেশ সাপোর্ট পাচ্ছেন বলে জানালেন।

কসবায় কর্মরত অ্যাসি ল্যান্ড হাসিবা খান অবশ্য এই সময় স্বামীর সাপোর্টটা পাচ্ছেন না। পুলিশে কর্মরত বিধায় তিনি আছেন নিজ দায়িত্বে। হাসিবা বলেন, ‘সাড়ে সাত মাস বয়সী মেয়ে আনাবিয়া-নূরকে সামলাতে ভার্সিটি পড়ুয়া আমার ছোট বোন ইসরাত জাহানকে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এমনও হয়েছে যে কাজের মধ্যেই খবর পেলাম মেয়েটা কাঁদছে, তখন ছুটে আসতে হয়। আবার কখনো তাত্ক্ষণিক ছুটে আসাও সম্ভব হয় না। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নের কথা মাথায় রেখে এভাবেই মানিয়ে চলছি। ’



সাতদিনের সেরা