kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

মানুষকে সেবা দিতে না পারলে ডাক্তার হয়ে কী লাভ?

পটুয়াখালী প্রতিনিধি   

১৪ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মানুষকে সেবা দিতে না পারলে ডাক্তার হয়ে কী লাভ?

ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ

‘মা, বাবা কোথায়? বাবাকে দেখি না কেন? কখন আসবে বাবা? বলো না কেন?’ ৪৮ দিন বাবাকে দেখতে না পেয়ে এভাবে যখন-তখন মায়ের কাছে আকুতি জানায় চার বছরের শিশু রুদাব। কখনো আবার সে বাবার জন্য হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তখন রুদাবকে তার বাবা ভালো আছেন; শিগগিরই বাড়িতে আসবেন—এসব কথা বলা হয়। কিন্তু মায়ের কোনো সান্ত্বনাই থামাতে পারে না রুদাবকে। বহুদিন যে সে বাবাকে কাছে পাচ্ছে না!

রুদাবরা পটুয়াখালী শহরে চিকিৎসকদের কোয়ার্টারে থাকে। তার বাবা চিকিৎসক আবদুল মুনয়েম সাদ রোগীদের চিকিৎসার জন্য আছেন জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে।

ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ৩৩তম ব্যাচের স্বাস্থ্য ক্যাডার। পটুয়াখালী সদর উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) থাবায় কত না মানুষের জীবন সংকটাপন্ন। মূলত তাঁদের সেবার জন্য প্রিয় সন্তান ও পরিবারের কাছ থেকে দূরে আছেন সাদ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকে কাজ করছেন তিনি। টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে তাঁর সঙ্গে থাকা টেকনিশিয়ানরা করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করেন। বিষয়টি তদারক করেন সাদ। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে কারো করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে তাঁর নেতৃত্বে মাঠে গিয়ে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া জেলায় যত করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হয় তা সাদের মাধ্যম হয়ে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়।

ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহে গেলে বোঝা যায় কোন রোগী পজিটিভ বা নেগেটিভ হবে। আর নিবিড়ভাবে নমুনা সংগ্রহ করা না হলে রোগীর ফলাফলে সন্দেহ থেকে যায়। এ কারণে পজিটিভ রোগীদের খুব কাছে যেতে হয় তাঁদের সুস্থতার জন্য।’ সাদ বলেন, ‘বেঁচে থাকলে সন্তানসহ পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা হবে। আর পেশা যখন মানবসেবা তাই ২৫ মার্চ থেকে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে থাকছি। পরিবারকে অনেক মিস করলেও কিছু করার নেই। প্রয়োজনটা মানবতার। তাই অন্য কিছু ভাবনার সময় নেই। এই ক্রান্তিকালে মানুষকে বাঁচানোর স্বার্থে যদি চিকিৎসাসেবা দিতে না পারি তাহলে ডাক্তার হয়ে লাভ কী? আমার ছেলেটা শিশু; তাই ও আমার জন্য কান্নকাটি করে। কিন্তু পরিবারের সবাই আমাকে সাহস দিচ্ছে; সমর্থন করে যাচ্ছে নিয়মিত।’

ডা. সাদের বাবা ডা. মো. আবদুল ওয়ারেস। তিনি বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের (শেবাচিম) সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সরকারি কর্মজীবন শেষ করেন। মা মমতাজ বেগম। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে সাদ। সাদের স্ত্রী লুত্ফুর নাহার শিবলী এক্সিম ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারের সুখের জন্য চাকরিটি ছেড়ে দেন শিবলী।

ডা. আবদুল ওয়ারেস বলেন, ‘দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে আমাদের ছেলে রাত-দিন কাজ করবে, এটাই কাম্য। আমরা তাঁকে সব সময় সাহস জোগাই। ছেলে আমাদের গর্ব।’ লুত্ফুর নাহার শিবলী বলেন, “ওর (সাদ) সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। তার পরও রুদাব বাবাকে কাছে পাওয়ার জন্য খোঁজ করে। আমি বলি, বাবা অফিসের কাজে ব্যস্ত, বাবা ফিরবে। কিন্তু ওর কান্না থামানো যায় না। আবার কখনো বলে, ‘মা তুমি বাবাকে লুকিয়ে রেখেছ।’ এভাবেই চলছে দেড় মাস ধরে। পরিবেশ যদি আবার স্বাভাবিক হয় তখন সাদ বাসায় ফিরবে। মানবসেবায় সাদ যা করছে তার প্রতি আমাদের পরিবারের শতভাগ সমর্থন রয়েছে।”

 

 

মন্তব্য