kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

বাংলাদেশে প্রিয়মুখ বলিউড অভিনেতা ইরফান খান আর নেই

বিনোদন প্রতিবেদক   

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশে প্রিয়মুখ বলিউড অভিনেতা ইরফান খান আর নেই

মাত্র চার দিন আগেই মারা গেছেন মা। নিজে ২০১৮ সাল থেকে বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবু হার না মেনে জীবনকে আঁকড়ে ধরে লড়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আর পারলেন না। গতকাল বুধবার সকালে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনেতা ইরফান খান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর।

তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রিয়জনদের সান্নিধ্যেই তিনি বিদায় নিয়েছেন।’ তাঁর মৃত্যুতে বলিউডে সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিশিষ্টজনরাও।

গত শনিবার সকালে রাজস্থানের জয়পুর শহরে ৯৫ বছর বয়সে ইরফানের মা সাঈদা বেগম মারা যান। নিজের অসুস্থতা ও ভারতজুড়ে চলা লকডাউনের কারণে মুম্বাই থেকে জয়পুরে মায়ের শেষকৃত্যে যেতে পারেননি এই বলিউড অভিনেতা।  ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মৃত মাকে শেষবিদায় জানান তিনি। 

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরফানের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, এটি সত্য। কলোন ইনফেকশনের কারণে ইরফান খান মুম্বাইয়ের কোকিলাবেনের আইসিইউয়ে ভর্তি হয়েছেন। তিনি চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে আছেন। তাঁর শক্তি ও সাহস তাঁকে লড়াই করতে এবং এ পর্যন্ত আসতে সাহায্য করেছে। আমরা নিশ্চিত তাঁর অসাধারণ মনোবল ও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রার্থনা তাঁকে দ্রুত রোগমুক্ত করবে।’

২০১৮ সালের মার্চে ইরফান খানের নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার ধরা পড়ে। এর পরপরই চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যান। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘আংরেজি মিডিয়াম’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের জন্য তিনি ভারতে ফেরেন। এরপর আবার লন্ডনে চলে যান। সেখানে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার পর সেপ্টেম্বরে আবার দেশে ফেরেন।

১৯৬৭ সালে রাজস্থানের জয়পুরের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম ইরফানের। বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন, পারেননি। এরপর ছোটখাটো ব্যবসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ভাগ্য তাঁর জন্য লিখে রেখেছিল অন্য কিছুই। সে জন্যই হঠাৎ পেয়ে যান দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার বৃত্তি। পড়া শেষ করে অভিনেতা হতে পাড়ি জমান মুম্বাই। টিভিতে ছোটখাটো চরিত্র, টিউশন আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মেরামতের কাজ করে কোনোমতো মুম্বাইয়ে টিকে ছিলেন।

প্রথম ছবি মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ছবিটিতে ইরফানের চরিত্র সম্পাদনার টেবিলে বাদ পড়ে। পরের বছর রূপা গাঙ্গুলির বিপরীতে বাসু চ্যাটার্জির প্রশংসিত ‘কামলা কি মৌত’-এও দেখা যায় ইরফানকে, কিন্তু তাও বড় পর্দায় ভাগ্য খোলেনি। এরপর ১৯৯০-এর দশকে ‘চাণক্য’, ‘ভারত এক খোজ’, ‘চন্দ্রকান্ত’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘ডর’ ইত্যাদি টিভি সিরিয়াল করেন।

বড় পর্দায় তাঁর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ছবি ‘দ্য ওয়ারিয়র’। ২০০১ সালের এই ব্রিটিশ ছবি দিয়েই ভারত ও ভারতের বাইরে নজর কাড়েন। ২০০৩ সালে করেন বিশাল ভরদ্বাজের ‘মকবুল’। উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ অবলম্বনে এই ছবি অভিনেতা হিসেবে ইরফানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। একের পর এক ছবিতে সুযোগ পেতে থাকেন তিনি। ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে ৫০টিরও বেশি ভারতীয় সিনেমায় দেখা গেছে তাঁকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’, ‘পান সিং তোমার’, ‘দ্য লাঞ্চবক্স’, ‘হায়দার’, ‘তলোয়ার’, ‘পিকু’ ‘হিন্দি মিডিয়াম’ ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘পান সিং তোমার’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করে জেতেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ইরফানের শেষ ছবি ‘আংরেজি মিডিয়াম’ মুক্তি পায় ১৩ মার্চ।

ভারত ছাড়াও হলিউড ছবিতেও নিয়মিত অভিনয় করেছেন তিনি। নির্মাতা শেখর কাপুর তাঁকে হলিউডে ‘সবচেয়ে সফল ভারতীয় অভিনেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ‘দ্য নেমসেক’, ‘স্লামগড মিলিওনেয়ার’, ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’, ‘লাইফ অব পাই’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’, ‘ইনফার্নো’র মতো বড় বাজেটের ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। শুধু তা-ই নয়, চরিত্র পছন্দ না হওয়ায় স্কারলেট জোহানসনের বিপরীতে স্টিভেন স্পিলবার্গের ছবিও ফিরিয়ে দেন তিনি!

ইরফান করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রও। ২০১৭ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’-এ জাভেদ হাসান চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। বাংলাদেশে শুটিং হওয়া ছবিটির সহপ্রযোজকও ছিলেন ইরফান। অভিনেতার মৃত্যুর খবরে ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই হৃদয় ভেঙে যাওয়ার খবর।’ ‘ডুব’ মুক্তির কিছুদিন পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ইরফান।

অভিনেতা হিসেবে ইরফানের বড় কৃতিত্ব পর্দায় একেবারে ‘সাধারণ’ থাকা। নব্বইয়ের দশকে হিন্দি ছবির অনেক বড় তারকা যখন ‘অতি নাটকীয়’ অভিনয় দোষে দুষ্ট তখন ইরফানের অনায়াস অভিনয় যেন ছিল স্বস্তির পরশ। পর্দায় অসাধারণভাবে সাধারণ মানুষের চরিত্র তুলে ধরার জন্য তাঁকে ‘কমন খান’ বলা হতো। অভিনয়ের সময় চিত্রনাট্যের ধার ধারতেন না, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের মতো সংলাপ বলতেন। কখনো তাত্ক্ষণিকভাবে পুরো দৃশ্যই নিজের মতো করে সাজিয়ে দিতেন। এজন্য ‘পিকু’ পরিচালক সুজিত সরকার তাঁকে ‘কিং অব ইমপ্রোভাইজেশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইরফানের হঠাৎ মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলিউড। ইরফানের বন্ধু ও নির্মাতা সুজিত সরকার লিখেছেন ‘প্রিয় বন্ধু ইরফান, তুমি লড়েছ, লড়েছ এবং লড়েছ। তোমার জন্য সব সময়ই আমি গর্ব অনুভব করব।’ গতকাল সকালে তিনিই প্রথম টুইট করে অভিনেতার মৃত্যুর খবর জানান। অমিতাভ বচ্চন লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য এক প্রতিভা...অসাধারণ সহকর্মী, বিশ্ব চলচ্চিত্রে দারুণ অবদান রাখা এক শিল্পী খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’ প্রিয়াঙ্কা চোপড়া লিখেছেন, ‘পর্দায় তিনি ছিলেন ক্যারিসমেটিক, জাদুকরী।’ অক্ষয় কুমার লিখেছেন, ‘আমাদের প্রজন্মের অন্যতম সেরা অভিনেতা চলে গেলেন।’

ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও ইরফান দেশটির চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে বিয়ে করেন বাঙালি কন্যা সুতপা সিকদারকে। বাবিল ও আয়ান নামে তাঁদের দুই পুত্রসন্তান আছে।

 

মন্তব্য