kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

পাড়া-মহল্লায় স্ব-উদ্যোগে বাড়ছে ‘লকডাউন’

► জেলা-উপজেলা প্রশাসনও জারি করছে নির্দেশনা
► লকডাউনের আওতায় ৩৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্প
► অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা লকডাউন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাড়া-মহল্লায় স্ব-উদ্যোগে বাড়ছে ‘লকডাউন’

সারা দেশেই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় স্ব-উদ্যোগেও পৃথকভাবে ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন ‘লকডাউন’ বেড়েছে। ৩৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ পর্যটন জেলা কক্সবাজার এবং আরো বেশ কয়েকটি জেলা লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখাও লকডাউন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ অনেক জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যানবাহন ঢুকতে বা বের হতে দিচ্ছে না।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, সারা দেশেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মুদি দোকান ও কাঁচাবাজার খোলা থাকছে। আর সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকছে সুপারশপ। এই নির্দেশনা বলবতে কড়া অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী।

সরেজমিনে গিয়ে গতকাল রাজধানীতে প্রশাসনিক নির্দেশনা না মানার প্রবণতাও দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে। নগরের প্রধান প্রধান সড়কে আগের চেয়ে অনেকটাই সীমিত হয়েছে যানবাহন চলাচল। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দোকান ও কাঁচাবাজার খোলা থাকার সময় মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না। গায়ে গা ঘেঁষেই কেনাকাটা চলছে। কাঁচাবাজারে জনসমাগমও বেশি দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের পক্ষে দেশের প্রতিটি অলিগলিতে সব সময় নজর রাখা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে অলিগলিতে তদারকি করতে পারেন।

রাজধানীতে অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার এক কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর গতকাল সকালে শাখাটি লকডাউন করা হয়। সর্বশেষ গত রবিবার ওই কর্মকর্তা অফিস করেন। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় একজন সিনিয়র অফিসার করোনা আক্রান্ত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করে শাখাটি লকডাউন করা হয়েছে।

সিলেটে একের পর এক এলাকা স্বেচ্ছায় লকডাউন হচ্ছে। এলাকাবাসী সাইনবোর্ড টানিয়ে রাস্তার প্রবেশমুখ বন্ধ করে দিচ্ছে। গত তিন দিনে নগর ও বিভিন্ন উপজেলার অর্ধশতাধিক এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব এলাকায় বহিরাগত কেউ ঢুকতে পারছে না।

সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের আম্বরখানা মণিপুরিপাড়া, লামাবাজার মণিপুরিপাড়া, পাঠানটুলা, সুবিদবাজার লন্ডনী রোড, আম্বরখানা বড়বাজার, নয়াসড়ক মিশন গলি, কলাপাড়া, আখালিয়া ব্রাহ্মণশাসন, খাদিমপাড়া, খাসদবিরসহ বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দারা রাস্তা আটকে দিয়ে কাগজে লিখে রেখেছে ‘লকডাউন এলাকা’।

খুলনা মহানগরীসহ জেলায় অনুমতি ছাড়া যানবাহান প্রবেশ-প্রস্থানে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল দুপুরে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়। এর আগে গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টায় সরকার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি ও যানবাহনের গমনাগমন ছাড়া অন্য সব ব্যক্তি ও যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দোকান ও বাজার প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। তবে রূপসা সন্ধ্যা বাজার, কেসিসি সন্ধ্যা বাজার ও সোনাডাঙ্গা টার্মিনাল কেসিসি পাইকারি কাঁচাবাজার রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারকেও। গতকাল বিকেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন পুরো জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেন। তিনি জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাইরের কেউ কক্সবাজারে ঢুকতে পারবে না। কেউ বেরোতেও পারবে না। সড়ক, আকাশ ও জলপথ বন্ধ থাকবে।

লালমনিরহাটে গতকাল সকালে জেলা প্রশাসক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে জেলায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন। এত কিছুর পরও লোকজন সুযোগ পেলেই নামছে রাস্তায়। এ অবস্থায় গতকাল বিকেলে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাটগ্রাম অংশে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেলগেটের প্রতিবন্ধকতা (ব্যারিকেড) ফেলে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে মেডিক্যাল সার্ভিস, অ্যাম্বুল্যান্স, ফায়ার সার্ভিস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন, সংবাদপত্র, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াতের জন্য গেটটি খুলে দেওয়া হচ্ছে।

ঝালকাঠিতে অঘোষিত ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে শহরের সব সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। বাঁশ দিয়ে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পুলিশের কয়েকটি টিম শহরের মোড়ে মোড়ে চোকপোস্ট বসিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। অহেতুক বাইরে বের হওয়া জনসাধারণকে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। সুগন্ধা নদীর সব খেয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম মাহমুদ হাসান বলেন, ঝালকাঠি জেলাকে নিরাপদ রাখতে শহরের প্রবেশদ্বারসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁশ দিয়ে সড়ক আটকে দেওয়া হয়েছে।

নরসিংদী জেলাকে অবরুদ্ধ ঘোষণা করেছেন জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। গতকাল এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়ক ছাড়া জেলা ও উপজেলার সব রাস্তা ও সীমানা দিয়ে ভিন্ন জেলায় যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণজমায়েত, গণপরিবহন, দিন-রাতে জনসাধারণের চলাচল বন্ধ। তবে জরুরি সেবা, খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ ও চিকিৎসা এর আওতাবহির্ভূত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গলিতে গলিতে বসেছে বাঁশের ব্যারিকেড। রাখা হয়েছে সাবান ও পানি। আছে পাহারাও। গলির রাস্তাগুলোতে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের না হতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছায় ‘লকডাউন’ করে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাধানগর চৌরাস্তার মোড় থেকে দাসপাড়ায় প্রবেশ ও শেষের দিকে বাঁশ দিয়ে আটকানো। মাঝে বেলতলী নামের একটি এলাকায় প্রবেশেও একই অবস্থা। এ ছাড়া থানা ভবনের বিপরীতে ঘোষপাড়া সেতুর কাছের মোড়, কলেজপাড়া প্রবেশের পথ, নারায়ণপুর গ্রামে ঢোকার পথে বাঁশ দিয়ে রাখা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে রংপুর নগরীতে সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ওষুধের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল আলিম মাহমুদ জানান, প্রশাসনের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। আর চোখের আড়াল হলেই বেড়ে যায় মানুষের চলাচল। তাই বাধ্য হয়েই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এক কনস্টেবলের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। গতকাল পরীক্ষার এই ফল জানার পর সন্ধ্যা থেকে ৪৩৪ সদস্যসহ মুক্তাগাছা এপিবিএন লকডাউন ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। আর ওই কনস্টেবলকে নগরীর এস কে হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।

এদিকে ময়মনসিংহ পিসিআর ল্যাবে গতকাল ৫০টি নমুনা পরীক্ষায় দুজনের পজিটিভ আসে। তাঁদের একজন মুক্তাগাছার এপিবিএনের কনস্টেবল ও অপরজন জামালপুরের মাদারগঞ্জের।

নাটোরের বাগাতিপাড়ার দেবনগর ও মাছিমপুর নামের দুটি গ্রাম গতকাল লকডাউন করেছে স্থানীয়রা। গ্রামের প্রবেশপথে বাঁশের প্রতিবন্ধকতা দিয়ে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রবেশমুখে রাখা হয়েছে সাবান ও পানি। নিজেদের প্রয়োজনে কেউ বাইরে গেলেও ফেরার পথে ওই সাবান-পানিতে হাত-পা ধুয়ে গ্রামে ঢুকতে হচ্ছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা