kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

প্রসূতিকে ফিরিয়ে দিল মাতৃসদন রাস্তায় সন্তান প্রসব

‘লকডাউনের কবলে পড়ে’ পথে আরেক নারীর সন্তান জন্ম

গাইবান্ধা ও জামালপুর প্রতিনিধি   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রসূতিকে ফিরিয়ে দিল মাতৃসদন রাস্তায় সন্তান প্রসব

রাতে এক নারীর প্রসব বেদনা উঠলে স্বজনরা অনেক কষ্টে একটি অটোরিকশা জোগাড় করে দ্রুত তাঁকে নিয়ে যায় গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে (মাতৃসদন)। কিন্তু সেখানে তাঁকে ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেন কেন্দ্রে কর্তব্যরতরা। ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তায় গাড়িটিতেই সন্তান প্রসব হয়ে যায় ওই গৃহবধূর। গত সোমবার রাত পৌনে ৮টার দিকে মাতৃসদনটির মাত্র ২০০ গজ দূরে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন ঘেরাও করে মাতৃসদন।

এদিকে জামালপুরের ইসলামপুরে ‘লকডাউনের কবলে পড়ে’ ইজি বাইকের যাত্রী এক প্রসূতি রাস্তায় সন্তান প্রসব করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ইসলামপুর সরকারি কলেজ মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা রেলের গেট ব্যারিয়ার তুলে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় অন্য রাস্তা দিয়ে উপজেলা হাসপাতালে যাওয়ার পথে ঘটনাটি ঘটে।

গাইবান্ধার ঘটনায় গঠিত দুই সদস্যের একটি টিম গতকাল তাঁদের তদন্ত সম্পন্ন করেছে। তদন্ত টিম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক আফসারী খানম, অভিযুক্ত এফডাব্লিউভি তৌহিদা বেগমসহ অন্যদের বক্তব্য নেয়। এ সময় পৌর কাউন্সিলর শহীদ আহম্মেদ, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ ওয়াজিউর রহমান রাফেলসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসূতির নাম মিষ্টি আকতার (২০)। তিনি সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের আব্দুর রশিদের স্ত্রী। আব্দুর রশিদ জানান, মিষ্টি আকতারকে নিয়ে গেলে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মী তৌহিদা বেগম কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই প্রসূতিকে অন্যত্র নিয়ে যেতে বলেন। পরিবার একাধিকবার ডেলিভারির জন্য অনুরোধ করলেও তৌহিদা শোনেননি। দীর্ঘ সময় পর অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় কেন্দ্রের কাছেই মধ্যপাড়া সরকারি বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় প্রচণ্ড ব্যথায় প্রসূতি চিত্কার শুরু করেন। এ সময় আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষ এগিয়ে আসে। স্থানীয় নারীদের সহায়তায় একপর্যায়ে তিনি অটোরিকশাতেই একটি ছেলেসন্তান প্রসব করেন। প্রসবের পর মায়ের প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। তাঁর আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে নিয়ে গিয়ে কেন্দ্রটি ঘেরাও করে। পরে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিকিৎসা দেয়।

ওয়াজিউর রহমান র‌্যাফেল বলেন, মাতৃসদনে গিয়ে সহজে সেবা পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানুষের সঙ্গে সব সময় অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা রোগী না দেখেই ক্লিনিকগুলোয় যেতে এক রকম বাধ্য করেন। গাইবান্ধা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহিদ আহমেদ বলেন, এই কেন্দ্রের কর্মীরা বরাবর খারাপ আচরণ করে থাকেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় তদন্ত টিমের প্রধান জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, দু-এক দিনের মধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে। গাফিলতি ও অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জামালপুরে পথে সন্তান প্রসব

ইসলামপুরের ঘটনায় গ্রামবাসী, প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগে তোলপাড় শুরু হওয়ায় বিকেলে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে করে প্রসূতি ও নবজাতককে উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুর সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।    

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে গতকাল সকাল থেকেই ইসলামপুরের কলেজ রোডে রেলের গেটবেরিয়ার ফেলে কে বা কারা যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। উপজেলা হাসপাতালে যেতে সকাল সোয়া ১১টার দিকে উপজেলার ধনতলা গ্রামের প্রসূতি বন্যাকে (২২) বহনকারী ইজিবাইক রেলগেটে এলে সেখানে কর্তব্যরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য গেটবেরিয়ার উঠানো সম্ভব নয় বলে তাঁদের অন্য রাস্তায় হাসপাতালে যেতে বলেন। স্বজনরা তাঁকে নিয়ে অন্য রাস্তায় হাসপাতালে যেতে ইজিবাইকটি ঘুরিয়ে ইসলামপুর সরকারি কলেজে গেট এলাকায় পৌঁছলে প্রসূতি একটি ছেলেসন্তান প্রসব করেন। পাশের বাড়ির কয়েকজন নারী ইজিবাইক থেকে প্রসূতিকে নামিয়ে বাড়িতে নিয়ে প্রসবে সহায়তা করেন। কিছুক্ষণ পর ইজিবাইকে করে প্রসূতি ও নবজাতককে ইসলামপুর উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক নবজাতককে উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুর সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় লকডাউন পরিস্থিতিতে জামালপুরে যাওয়া সম্ভব নয় বিধায় স্বজনরা প্রসূতি ও নবজাতককে একই ইজিবাইকে করে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যান।

ধনতলা গ্রামের মো. এনামুল হকের স্ত্রী প্রসূতি বন্যা ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সন্তান প্রসবের জন্য মাস তিনেক আগে তিনি বাড়িতে চলে আসেন।

এদিকে ঘটনাটি জেনে ইসলামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল আব্দুন নাছের চৌধুরী বাবুল, ইউএনও মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পৌরসভার মেয়র শেখ আব্দুল কাদের, ইসলামপুর সার্কেলের এএসপি মো. সুমন মিয়া গতকাল বিকেলে ওই প্রসূতির খোঁজ নিতে তাঁর গ্রামের বাড়িতে যান। তাঁরা প্রসূতি ও নবজাতকের উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসলামপুর হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সে করে জামালপুর সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থার পাশাপাশি সব রকমের সহায়তার আশ্বাস দেন। এএসপি মো. সুমন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে গেটবেরিয়ার নামিয়ে রাস্তা বন্ধ করা হয়নি। কারা গেটবেরিয়ার নামিয়ে রেখেছে তা আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’ 

প্রথমবারই হাসপাতালে এলে প্রসূতি ও নবজাতককে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে করে জামালপুরে কেন পাঠানো হলো না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এ এম আবু তাহের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্তানটি সাত মাসের মাথায় জন্মেছে। নবজাতকের খুব ক্রিটিক্যাল অবস্থা দেখেই হয়তো জরুরি বিভাগ থেকে তাদের জামালপুরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের কাজে আমি ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ করছিলাম। আমি ঘটনাটি শুনে বিকেলে প্রসূতির বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, মেয়র ও সার্কেল এএসপি আমার সঙ্গে ছিলেন। আমরা শিশুটির জরুরি উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সে করেই প্রসূতি ও নবজাতককে জামালপুর সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা