kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

রক্ষণাত্মক কৌশলেই এগোচ্ছে বিশ্ব

► লকডাউনসহ বিভিন্ন বিধি-নিষেধ দীর্ঘায়িত হতে পারে
► চীনে জানুয়ারির পর এই প্রথম মৃত্যুহীন এক দিন
► বিশ্বে আক্রান্ত ১৪ লাখ ছুঁই ছুঁই, মৃত্যু প্রায় ৮০ হাজার
► আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কয়েক দিন ধরেই কমছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রক্ষণাত্মক কৌশলেই এগোচ্ছে বিশ্ব

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ ঠেকাতে এখন পর্যন্ত রক্ষণাত্মক কৌশলেই এগোচ্ছে বিশ্ব। কোথাও কোথাও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কিছুটা কমলেও জনগণের জীবনযাত্রা শিথিল করার সাহস দেখাতে চাইছে না প্রায় কোনো রাষ্ট্রই। উল্টো নতুন নতুন কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। 

এশিয়ার দেশ জাপানের কয়েকটি শহরে গতকাল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে সৌদি আরবের পাঁচটি শহরে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মরক্কোতে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরায়েল। শিক্ষা ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান আরো তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকবে নিউ ইয়র্কে। সারা বিশ্বেই লকডাউনসহ বিভিন্ন বিধি-নিষেধের মেয়াদ আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ২০৯টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাস ছড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ লাখের কাছাকাছি। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের। তবে স্বস্তির খবর হলো, বৈশ্বিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কয়েক দিন ধরেই কমছে। এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিউ ইয়র্ক সময় অনুযায়ী আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভিডিও কনফারেন্স করতে পারে।

দেশে দেশে কঠোর পদক্ষেপ

রাজধানী টোকিওসহ জাপানের কয়েকটি শহরে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। টোকিও ও ওসাকার মতো ব্যস্ত নগরীতে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বাড়তে থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গতকাল মধ্যরাত থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। জরুরি অবস্থা থাকবে এক মাস। জাপানে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে তিন হাজার ৯০৬ এবং ৯২।

রাজধানী রিয়াদসহ সৌদি আরবের চারটি গভর্নরেট (বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল) ও পাঁচটি শহরে কারফিউয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা করা হয়েছে। চারটি গভর্নরেট এলাকা হলো জেদ্দা, তাইফ, কাতিফ ও খোবার। আর পাঁচটি শহর হলো রিয়াদ, তাবুক, দাম্মাম, দাহরাম ও হফুফ। সৌদি আরবে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে দুই হাজার ৭৫২ এবং ৩৮।

ইসরায়েলে গতকাল থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করতে হবে।’ ইসরায়েলে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৬০ জনের। ঘরের বাইরে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মরক্কোতে। সাত দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ (১১২০) হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।

ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড সীমান্তে আরো কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফিনল্যান্ডের সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে যাওয়া-আসা করে সুইডেনের মানুষ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ সীমান্ত ব্যবহার করতে পারবে না। করোনাভাইরাস মোকাবেলার অংশ হিসেবে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ পোল্যান্ড। গত সোমবার দেশটির পার্লামেন্টে এ বিষয়ক একটি প্রস্তাব পাস হয়।

আফ্রিকার দেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গোর বাণিজ্যিক শহর হিসেবে পরিচিত কিনশাসা জেলাকে অবরুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী নাইরোবির সঙ্গে অন্যান্য শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে আফ্রিকার আরেক দেশ কেনিয়া।

সার্বিক পরিস্থিতি

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা পর্যন্ত ২০৯টি দেশ ও অঞ্চল কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৯১ হাজার ১৫৪ জনে। মোট মৃত্যু হয়েছে ৭৯ হাজার ১৫২ জনের। সুস্থ হয়েছে দুই লাখ ৯৮ হাজার ৪৮৯ জন। চিকিৎসাধীন আছেন ১০ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। এদের মধ্যে মৃদু উপসর্গ রয়েছে ৯ লাখ ৬৫ হাজার ৭৩৩ জনের (৯৫ শতাংশ)। বাকি ৪৭ হাজার ৭৮০ জনের (৫ শতাংশ) অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া বিশ্বের প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে কভিডে আক্রান্ত হয়েছে গড়ে ১৭৮ জন। বৈশ্বিক মৃত্যুর হার ৫.৬০ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে নিউ ইয়র্কে; যদিও তিন দিন ধরে সেখানে দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার স্থিতিশীল রয়েছে। তবে স্থানীয় গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে রাজি নন। গত সোমবার তিনি ঘোষণা দেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আরো তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকবে।’ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ইতিবাচক ফলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এটা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শিথিল করার সময় এখনো আসেনি। জীবনযাপন শিথিল করলে তা মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।’

গতকাল রাত ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৮০ হাজার ৭৪৪। মৃত্যু হয়েছে ১১ হাজার ৯০৭ জনের। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় গত শনিবার, ৩৪ হাজার ১৯৬ জন। পরের দিন (২৫৩১৬) কমলেও সোমবার তা দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৩৩১ জনে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে শনিবার; ১৩৩০ জন। পরের দিন কিছুটা কমলেও (১১৬৫) সোমবার মৃত্যু হয় ১২৫৫ জনের। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নিউ ইয়র্কে; এক লাখ ৩১ হাজার ৯১৬ জন। এদিকে গতকাল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আরো ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

নতুন মৃত্যু নেই চীনে

করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ (কভিড-১৯)-এ গতকাল চীনে কারো মৃত্যু হয়নি। গত জানুয়ারির পর এই প্রথম দেশটিতে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ‘শূন্য’ হলো। তবে গতকাল দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছে ৩২ জন। এদের প্রায় সবাই বিদেশফেরত। ইরানে গতকাল আরো ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ৮৯। দেশটিতে মোট আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৫৮৯ এবং তিন হাজার ৮৭২। পাশের দেশ ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৯৮১। মৃত্যু হয়েছে ১১৪ জনের।

ইউরোপ পরিস্থিতি

ইতালিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা তিন দিন ধরে কমছে। গত শনিবার দেশটিতে আক্রান্ত হয় চার হাজার ৮০৫ জন। পরের দিন আক্রান্ত হয় চার হাজার ৩১৬ জন। আর সোমবার সেই সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ৫৯৯ জনে। গতকাল আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৩৯ জন। তবে রবিবার দৈনিক মৃতের সংখ্যা ৫২৫ থাকলেও পরের দিন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৬ জনে। কিন্তু গতকাল মৃতের সংখ্যা ছিল ৬০৪ জন। সব মিলিয়ে দেশটিতে মোট আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ৩৫ হাজার ৫৮৬ এবং ১৭ হাজার ১২৭ জন। স্পেনেও দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে। গত শনিবার দেশটিতে আক্রান্ত হয় ছয় হাজার ৯৬৯ জন। পরের দুই দিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৪৭৮ এবং পাঁচ হাজার ২৯ জন। দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যাও তিন দিন ধরে কমছে। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ৪০ হাজার ৫১১ এবং ১৩ হাজার ৮৯৭। জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ চার হাজার ১৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। সূত্র : এএফপি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা