kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার লক্ষণ নিয়ে আরো ১১ মৃত্যু

নমুনা সংগ্রহ, পরিবার হোম কোয়ারেন্টিনে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনার লক্ষণ নিয়ে আরো ১১ মৃত্যু

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায়ই স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও আশপাশের বাড়িঘরের লোকজনকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হয়েছে। স্থানীয় নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা বিস্তারিত জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম : করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে এক মুক্তিযোদ্ধাসহ দুজন মারা গেছেন। এর মধ্যে গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশনে মারা যান সীতাকুণ্ড থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলিম উল্লাহ (৭৫)। আর রবিবার রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে এক যুবকের মৃত্যু হয়। দুজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) ডা. অসীম কুমার নাথ গতকাল জানান, সীতাকুণ্ড থেকে কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৭১ বছর বয়সী এক রোগী (পুরুষ) আইসোলেশনে ভর্তি হন। এরপর ওই রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান। 

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন রায় বলেন, ‘গত রবিবার রাত ১১টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলিম উল্লাহ জ্বর ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করছেন জানিয়ে আমার কাছে একটি অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে বলেন। অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা হলে তিনি সরাসরি জেনারেল হাসপাতালে চলে যান। সেখানে তাঁর মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা তাঁকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। এখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান। মরদেহের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত দাফন করা যাবে না।’

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে মারা যাওয়া যুবকের নাম মোহাম্মদ শরীফ (২০)। তিনি শিলাইগড়া গ্রামের রাজা মিয়া বাড়ির মৃত আবুল কালামের ছেলে। জানা যায়, শরীফ রবিবার সন্ধ্যায় গলাব্যথা, সর্দিকাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৯টায় তাঁর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ করোনা সন্দেহে ওই এলাকার ১০টি পরিবারকে সাময়িকভাবে লকডাউন করে।

ফরিদপুর : করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আবু শেখ (৭০) নামের এক ব্যক্তি গতকাল মারা গেছেন। তাঁর বাড়ি মধুখালী উপজেলার চরমুরারদিয়া গ্রামে। তিনি গত ৪ এপ্রিল শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ওই  হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুর রহমান জানান, ওই ব্যক্তি কিডনির সমস্যা, জ্বর ও নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন। গত রবিবার তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সকালে মারা যাওয়ার পর দুপুরের দিকে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

হবিগঞ্জ : চুনারুঘাট উপজেলার পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে করোনা সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে এক বৃদ্ধ গতকাল নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। মারা যাওয়া শাহনুর মিয়া (৭০) শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-জ্বরে ভুগছিলেন। তাঁর মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রশাসন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৪২টি পরিবারের চলাচল সীমিত করে পানছড়ি বাজারটি বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের বাড়িঘরের সবাইকে সাবধানে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান তরফদার সবুজ জানান, শাহনুর মিয়া পানছড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করতেন এবং পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর মূল বাড়ি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সব পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিস উপজেলা প্রশাসন সরবরাহ করবে।

বরিশাল : শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ইউনিটে আরো এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে নগরীর কাউনিয়ার তালতলা এলাকার বাড়ি লকডাউন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান এ ঘোষণা দেন। মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম ইউসুফ আলী (৫০)। তিনি নগরীর কাউনিয়ার তালতলা এলাকার বাসিন্দা। এর আগে শেবাচিম হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরো তিন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তাঁদের নমুনা পরীক্ষায় অবশ্য করোনা নেগেটিভ ফল আসে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ওই ব্যক্তি গতকাল বিকেলে জ্বর-সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এলে করোনা ইউনিটে পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। তাঁর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

রাজবাড়ী : করোনা সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে পাংশা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সেনগ্রামে রুহুল শেখ (৩০) নামে এক ট্রাকচালকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ওই গ্রামের মৃত হবিবুর রহমানের ছেলে। পাংশা থানার ওসি মো. আহসানুল্লাহ জানান, রুহুল শেখ ঢাকার সাভার উপজেলার নবীনগরে ড্রাম ট্রাক চালাতেন। কয়েক দিন আগে তিনি পাবনার শ্বশুরালয়ে যান। সেখান থেকে গত রবিবার তিনি পাংশার গ্রামের বাড়িতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন। গতকাল তিনি মারা যান। সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, রুহুল শেখের সর্দি, কাশিসহ নানা রকম সমস্যা ছিল। সে কারণে তাঁর করোনাভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

গাজীপুর : কাপাসিয়ায় শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৩৫ বছর বয়সী এক নারী গতকাল নিজ বাড়িতে মারা যান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবদুস সালাম সরকার জানান, ওই নারীর জ্বর বা সর্দি-কাশি ছিল না। তা ছাড়া আগে থেকেই তাঁর শ্বাসকষ্ট ছিল। তার পরও সতর্কতার অংশ হিসেবে তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরিবারের এই চার সদস্যকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ : করোনা সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামের ওহাব দেওয়ান মারা গেছেন। গতকাল সকালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি ঢাকার ওয়ারীতে মারা যান। খবর পেয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়ারীর ওই এলাকাটি লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে।  চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, ওহাবের লাশ প্রশাসন থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে তিনি করোনায় মারা গেছেন কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। আইইডিসিআরে নমুনা পরীক্ষার পর নিশ্চিত করেই লাশ দাফন করা হবে বলে পারিবারিকভাবে জানা গেছে।

এদিকে লৌহজংয়ের কনকসার ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, ওহাব কনকসার গ্রামের মঙ্গল দেওয়ানের ছেলে। গত শনিবার তিনি কনকসারে এসে এলাকাবাসীর মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে গেছেন।

গাইবান্ধা : সর্দি-জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে গত সদর উপজেলার গোঘাট গ্রামে আবদুর রাজ্জাক (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ওই ব্যক্তির বাড়িসহ আশপাশের ছয়টি পরিবার এবং তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসককে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জানান, আবদুর রাজ্জাক ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। গত ২৫ মার্চ তিনি জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এর আগে থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। সিভিল সার্জন ডা. এ বি এম আবু হানিফ জানান, গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওই যুবকের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তা পরীক্ষার জন্য গতকাল রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আর রবিবার রাতেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ নিয়ে গতকাল নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় খায়রুল ইসলাম (১৮) নামের এক তরুণ মারা গেছেন। তাঁর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত ওই বাড়ির লোকজনকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, পৌর এলাকার বাসিন্দা খায়রুল পেশায় রিকশাচালক। গত রবিবার রাতে তাঁর জ্বর, পেট ব্যথা ও পাতলা পায়খানাসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। গতকাল সকালে তিনি মারা যান।

তাড়াশ-রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) : করোনার উপসর্গ জ্বর, সর্দি-কাশি ও বমিতে আক্রান্ত হয়ে তাড়াশে জিহাদুল ইসলাম জিহাদ (২২) নামে এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। জিহাদ সরাপপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে। পরিবার বলছে, জিহাদ দীর্ঘদিন ধরে জন্ডিসে ভুগছিলেন। পাঁচ দিন আগে তিনি ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরেন। গতকাল সকালে অবস্থার অবনতি হলে বগুড়া নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা