kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

রূপনগরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল পেল ৬০০ জন

স্বস্তিতে সেতারা বেগমরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রূপনগরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল পেল ৬০০ জন

‘কোনো খাওন পাই না; আমাগোরে কেউ রিলিফ দেয় না, মাইয়াগোরে দেয়।’ কাঁদো কাঁদো স্বরে কথাগুলো বলছিলেন সেতারা বেগম (৬২)। পাঁচ সন্তানের এই জননী থাকেন রূপনগর  ঝিলপাড় বস্তিতে। ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার খবর শুনে গতকাল রবিবার ফজরের নামাজের পরপরই এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সকাল সাড়ে ১০টায় পেলেন পাঁচ কেজি চাল।

সেতারা কালের কণ্ঠকে জানান, বাসায় বাসায় ঝিয়ের কাজ করতেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বাসাবাড়ির কাজ হারিয়েছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালক সন্তানদের আয়ও বন্ধ। ফলে পুরো পরিবার খাবারের সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়েই লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কম দামে চাল পেয়ে তিনি আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।

শুধুই সেতারা বেগম, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বা ৬৫ বছরের সাহেরা বিবি নন; এ রকম শত শত নারী-পুরুষ গতকাল লাইনে দাঁড়িয়েছেন ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়ার আশায়। রূপনগর আবাসিক এলাকায় মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন সড়কে নিম্নবিত্ত, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে সরকার বিশেষ সুবিধায় চাল বিতরণ করে। এখানে কয়েক দফায় আগুনে পুড়ে যাওয়া চলন্তিকা বস্তিতে বসবাসকারী দুস্থ নারী ও কর্মহীন মানুষের মধ্যে চাল বিক্রি শুরু হয় সকাল ১০টার দিকে।

খাদ্য অধিদপ্তরের খোলাবাজারে খাদ্য বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির আওতায় এদিন ৬০০ জনকে চাল দেওয়া হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত হওয়ায় স্থানীয় কাউন্সিলর তোফাজ্জল হোসেন টেনু এই চাল বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। খাদ্য অধিদপ্তরের বি-৭, মিরপুর এলাকার রেশনিং কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক এই কর্মসূচি তদারক করেন। এই চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না তা দেখভাল করেন রূপনগরের এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসমিন মুনিরা।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসার আগেই চাল বিতরণ শুরু হয়। আর শুরুর দিকে স্থানীয় মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে চাল বিতরণে নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ কারণে কিছুটা জটলার সৃষ্টি হয়। তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসেই সামনে থেকে ভিড় সরিয়ে দেন। একাধিকবার সুযোগ গ্রহণ বন্ধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে চাল দেওয়া হয়। এর ফলে ভাসমান মানুষ এ সুবিধা পায়নি। এ ছাড়া লাইনে দাঁড়িয়েও দুশতাধিক মানুষ চাল পায়নি। 

রেশনিং কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক জানান, বঞ্চিতদের আগামী মঙ্গলবার চাল দেওয়া হবে। আর প্রতি সপ্তাহে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার এ কর্মসূচি চলবে।

‘বাসায় বাচ্চা রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে দিনটাও মাটি, চালও পেলাম না’

রাজধানীর মহাখালী সাততলা বস্তি এলাকায় উপচে পড়া ভিড় ছিল ১০ টাকা কেজির চাল কিনতে। সকাল ১০টার দিকে চাল বিক্রি শুরু হলেও ৯টার মধ্যেই তিন শতাধিক মানুষ উপস্থিত হন সেখানে। এ সময় ক্রেতাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বও বজায় থাকেনি। মহাখালীর কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট ভবনের সামনে উপস্থিত ক্রেতার ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় বিক্রেতাদের।

খোলাবাজারে চাল বিক্রির প্রথম দিনে গতকাল জনপ্রতি পাঁচ কেজি করে মোট ৬০০ জন চাল পেয়েছেন। তার পরও শেষ পর্যন্ত চাল না পেয়ে ফিরে গেছেন দেড়শতাধিক ক্রেতা। তাদের আগামীকাল মঙ্গলবার আসতে বলা হয়েছে।

চাল না পেয়ে ফিরে যাওয়াদের একজন জয়শ্রী রানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাল কিনতে সকাল ১১টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রায় দুঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমাকে আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) আনতে বলা হয়। আইডি কার্ড নিয়ে আসার পর এখন বলা হচ্ছে চাল শেষ হয়ে গেছে, মঙ্গলবার আসতে হবে। বাসায় বাচ্চা রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দিনটাও মাটি হলো, চালও পেলাম না।’

দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর আড়াইটায় ১০ টাকা দরে পাঁচ কেজি চাল কিনতে পেরে খুশি আব্দুর রহিম। পেশায় রিকশাচালক এই ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই রইদে তিন ঘণ্টা লাইনে খাড়ানোর পরে চাইল পাইলাম। তাই ভালো লাগতাছে। তয় এক সপ্তাহের জন্য একজনকে ১০ কেজি করে (চাল) দিলে ভালা অইতো।’

তবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হওয়ায় অনেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হালিমা খাতুন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘লাইনে থাইকা চাইল কিনতে অনেক সময় লাগতাছে। হ্যারা যদি একটু তাড়াতাড়ি করত তাইলে আমগোর কষ্টটাও একটু কমত।’

সেখানে উপস্থিত খাদ্য অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা জানান, সপ্তাহে তিন দিন পৃথক ৬০০ জন করে মোট এক হাজার ৮০০ জনকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হবে। প্রথম দিন হওয়ায় লোকসমাগম বেশি হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা