kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

‘ঘরে থাকুন’ শক্ত অবস্থানে প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘ঘরে থাকুন’ শক্ত অবস্থানে প্রশাসন

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ১০ দিনের সাধারণ ছুটির প্রথম তিন দিন মানুষজন নির্দেশনা মেনে ঘরেই থাকে। তবে চতুর্থ দিন গত রবিবার থেকে বাইরে বেরোনোর প্রবণতা দেখা যায়। মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে গতকাল বুধবার থেকে প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের কারণে পাল্টাতে শুরু করেছে রাজধানীসহ সারা দেশের চিত্র।

অবশ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে তৎক্ষণাৎ ভিড় কমে যাচ্ছে ঠিকই, তবে তারা চলে যাওয়ার পর আবার জনসমাগম বাড়ছে। এরই মধ্যে সাধারণ ছুটির মেয়াদ ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ অবস্থায় লম্বা এই সময় মানুষকে ঘরে রাখতে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেসব সড়কে গত কয়েক দিনে পুলিশের টহল ও চেকপোস্ট কম ছিল, সেসব সড়কে টহল বাড়ানো হয়েছে। রামপুরা থেকে বাড্ডা এলাকার সড়কগুলোতে পুলিশের সাতটি চেকপোস্ট চোখে পড়ে। প্রতিটি চেকপোস্টেই চলছে তল্লাশি। তবে এর পরও সড়কে অনেক প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল দেখা যায়।

অলিতেগলিতে মানুষের জটলাও ছিল চোখ পড়ার মতো। ছোটখাটো বিভিন্ন দোকান খোলা ছিল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস, সেসব এলাকায় দোকানপাট বেশি খোলা দেখা গেছে। এ ছাড়া দিন আনে দিন খায়, এমন মানুষজন নিয়মিতই কাজের সন্ধানে বের হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অকারণে মানুষের বাইরে বেরোনো বন্ধে গতকাল সকাল থেকে সড়কে সড়কে টহল বাড়িয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে বেড়েছে সেনাবাহিনীর টহলও।

গতকাল বিকেল ৩টার দিকে দেখা যায়, বিজয় সরণির মোড় ও জাহাঙ্গীর গেটের মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় নামা মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তবে ঘুরেফিরে সবাই বাইরে বেরোনোর কারণ হিসেবে বাজার করা, ওষুধ কেনা, হাসপাতাল বা ব্যাংকে যাওয়ার কথাই বলছেন। রাইড শেয়ারিংয়ে যাত্রী পরিবহনও করতে দেখা গেছে।

বাড্ডা থানার সামনের সড়কে টহলে থাকা এএসআই মো. ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালো ব্যবহার করলেও কেউ কথা শোনে না। জোর করেও মানুষকে ঘরে ফেরানো যাচ্ছে না। গাড়ি থামালে বলে, হাসপাতালে যাচ্ছি। রোগী কে জানতে চাইলে বলে, নিকটাত্মীয়। তখন কি আর কিছু বলা যায়?’

কথা হয় আবুল কালাম নামের একজন সিএনজিচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দুই দিন ঘরে ছিলাম। এরপর বাধ্য হয়ে সিএনজি বের করি। কিন্তু হাতিরঝিল থানা পুলিশ গাড়ি জব্দ করে থানায় আটকে রেখেছে। এখন কিভাবে সংসার চলবে বুঝতে পারছি না।’

চট্টগ্রামেও তৎপরতা বাড়িয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী : চট্টগ্রামেও কয়েক দিন ধরে ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় বের করেছিল সাধারণ মানুষ। কিছু যাত্রীবাহী গাড়িও চলছিল। তবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চট্টগ্রামের ট্রাফিক পুলিশ। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে বেশ কিছু গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। তবে খাদ্য, ওষুধ ও রোগীবাহী গাড়িগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে।

গতকাল নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় বেশ কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে। রিকশার সংখ্যাও অনেক। রাইড শেয়ার করে এমন মোটরসাইকেলও চলছে কিছু কিছু। প্রাইভেট কার চালকরা জানান, তাঁরা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। কয়েকটি অটোরিকশা ও টেম্পোর চালক জানান, তাঁরা বেরিয়েছেন পেটের দায়ে।

নগর ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মো. তারেক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্ধের নির্দেশনার মধ্যেই গাড়ি নিয়ে যাত্রী পরিবহন শুরু করেছিল। যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে বন্ধের মধ্যেও নগরে যানজট তৈরি হবে।’

জানা গেছে, নগর পুলিশের দুটি জোন যৌথভাবে রবিবার ১৫২টি গাড়ি, সোমবার ১০১টি এবং মঙ্গলবার ১৬৪টি গাড়ি জব্দ করেছে।

পাবনা : পাবনার ভাঙ্গুড়ায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে গতকাল পৌর শহরে শরত্নগর হাট বসে। ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ ও ভাঙ্গুড়া পৌর কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাঁরা এতে সাড়া দেননি। পরে দুপুর ১২টার দিকে সেনা সদস্যদের গাড়ি ভাঙ্গুড়া শহরে প্রবেশ করে। এই খবর শরত্নগর হাটে ছড়িয়ে পড়তেই ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে পালান। ক্রেতারাও দ্রুত বাজার ছেড়ে যান।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুজ্জামান বলেন, লোকসমাগম বন্ধ করতে বৃহস্পতিবার থেকে প্রতিটা ইউনিয়নের হাট-বাজার নজরদারির মধ্যে আনা হবে।

মৌলভীবাজার : গতকাল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ মহড়া হয়েছে। পৌরসভার ভানুগাছ বাজার, আদমপুর, ইসলামপুর, মাধবপুর, ভাণ্ডারীগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে এ মহড়ার সময় জনসচেতনতায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়। মানুষজনকে প্রয়োজন ছাড়া বাজারে ভিড় না করার আহ্বান জানানো হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিত্যপণ্য ও ওষুধের দোকানের সামনে লাল ও সাদা বৃত্ত এঁকে দেওয়া হয়।

পিরোজপুর : পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবাণুনাশক স্প্রে করাসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছেন। গতকাল সেনা সদস্যরা পৌর শহরের জগন্নাথকাঠি বন্দর জগৎপট্টি বন্দর, ইন্দুরহাট, মিয়ারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় বন্ধ করা হয়েছে সোনাইচণ্ডী হাট। গতকাল সকালে নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের সোনাইচণ্ডী হাট বসার চেষ্টা করলে উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাত্ক্ষণিক সেখানে যান। পরে সেনা সদস্যরা উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণ করেন।

হবিগঞ্জ : গতকাল হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরীবাজার এলাকায় গিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হোম কোয়ারেন্টিন মেনে চলতে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার জন্য অনুরোধ করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এর আগে তাঁরা শায়েস্তাগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও বাহুবলেও প্রচারণা চালান।

নওগাঁ : নওগাঁর ধামইরহাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গতকাল দিনব্যাপী সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহল দেন। এতে সচেতন মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণপতি রায় জানান, খাবার, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা ছাড়া সবাইকে ঘরে থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সেনাবাহিনী : হোম কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গতকাল বুধবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে সেনাবাহিনী দেশের সব স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও হোম কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করবে। সরকারের দেওয়া নির্দেশাবলি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা