kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

মানা হচ্ছে না ‘সামাজিক দূরত্ব’

খাদ্যসামগ্রী হাতে পেতে ঠেলাঠেলি, হুড়াহুড়ি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খাদ্যসামগ্রী হাতে পেতে ঠেলাঠেলি, হুড়াহুড়ি

‘সামাজিক দূরত্ব’ করোনা সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শব্দযুগল। এই দুই শব্দের সঙ্গে পরিচয়ের সময়টাও দুই মাস পেরিয়ে গেল। সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ অনেকাংশে সম্ভব। এ কথা অনেকেরই জানা। তার পরও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না, মানা যাচ্ছে না। দুস্থদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় মনের অজান্তেই দূরে ঠেলে দেওয়া হয় ‘সামাজিক দূরত্ব’। খাদ্যসামগ্রী হাতে পেতে শুরু হয় অসম প্রতিযোগিতা। একপর্যায়ে তা রূপ নেয় ঠেলাঠেলি, হুড়াহুড়িতে। এর ফলে দুস্থদের মধ্যেই বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি। এ ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিলেট : সিলেটে দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রশংসা কুড়ালেও এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে করোনাভাইরাস বিস্তারের ঝুঁকি।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভেতরে শ্রমজীবীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। প্রধান ফটকের ভেতরে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে ১০০টি বৃত্ত তৈরি করে সেখানে বসানো হয় দুস্থদের। কিন্তু মূল ফটকের বাইরে শতাধিক মানুষ ঠেলাঠেলি করছে ভেতরে ঢোকার আশায়। তাদের মধ্যে হাতে-গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিদের ছিল না মাস্ক বা কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা।

এত মানুষের জড়ো হওয়ার বিষয়ে সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহিউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিতে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে জন্য আমরা ঢালাওভাবে এসব পণ্য বিতরণ করিনি। বরং আগের রাতে আমি নিজে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে শ্রমজীবী, বিশেষ করে রিকশাচালক ও ভিক্ষুকদের খুঁজে খুঁজে টোকেন দিয়ে এসেছি। আজ (মঙ্গলবার) যারা টোকেন নিয়ে এসেছে তাদের গেটের ভেতর তিন ফুট দূরত্বে দাঁড় করিয়ে নিয়ম মেনেই ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে অনেকে এসে জড়ো হয়েছে। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এর বেশি কী করার আছে।’

চট্টগ্রাম : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে অনুরোধ জানানো হচ্ছে, তা চট্টগ্রামেও মানা হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখা এবং কর্মহীনদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

গতকাল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। এ সময় তাঁর আশপাশে নেতাকর্মীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের দূরে দাঁড়িয়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার অনুরোধ জানালেও সংসদ সদস্যের সঙ্গে ছবি তোলার প্রয়োজনে নেতাকর্মীরা তাঁর পাশ থেকে সরেননি। এসব ছবি পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন কর্মীরা।

নগরীর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এসেছে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে। এসব সংগঠন বেশির ভাগই দিনের আলোতে মহাসড়ক ও অলিগলিতে গিয়ে মানুষ জড়ো করে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে।

সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, সরকারিভাবে যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে সেখানে মানুষ জড়ো করা হচ্ছে না। তবে বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা আছে। তবে তা প্রশাসনের নজরে এলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী: রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিতরণ করা খাদ্যসামগ্রী নিতে হুড়াহুড়ি লেগে যায়। একপর্যায়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে নগরীর অসহায় দরিদ্রদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি শুরু হয়। কিন্তু এ খাদ্যসামগ্রী নিতে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে ব্যাপক ভিড় করে। লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলেও শরীরের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে অসহায় মানুষগুলো ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। একপর্যায়ে করোনা বিস্তারের ভয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় প্রায় সময়ই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে না। অনেক সময় সাহায্য গ্রহণকারীরা মানলেও যাঁরা বিতরণ করেন তাঁদের দেখা যায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিতরণ করছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হবিগঞ্জ শহরের নাতিরাবাদ এলাকায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে জেলা ছাত্রদল। এ সময় বিতরণকারী নেতাদের পাশাপাশি দাঁড়াতে দেখা যায়। কিন্তু সাহায্য গ্রহণকারীদের দূরত্ব বজায় রেখেই বসতে দেখা গেছে।

ভালুকা (ময়মনসিংহ): স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার প্রচারণাসহ কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি গতকাল মানেনি স্থানীয়দের অনেকেই। স্থানীয় একাধিক বাজারে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই একে অপরের শরীর ঘেঁষে বাজার করছেন। ওই সময় কথা হলে একজন বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে আমি সচেতন। কিন্তু কী করব। আমি সাবধান থাকার জন্য একজনের কাছ থেকে দূরে যেতে চাইলে আরেকজনের শরীরে লেগে যায়।’

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী): খাদ্য সহায়তা পেতে পৌরসভাসহ এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে খেটে খাওয়া মানুষের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে কয়েক শ মানুষের ভিড়। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সেখানে মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। খাদ্য সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষায় একে অপরের শরীর ঘেঁষে তারা বসে আছে। এ সময় কর্তব্যরত ওই ইউপির এক সদস্য বলেন, ‘বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মানুষদের ভিড় না করে সবাইকে দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নিতে আমি বারবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তাদের অনেকেই আমার কথা শুনছে না।’

আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা): আলমডাঙ্গা শহরে কর্মহীন দরিদ্রদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারেও একই অবস্থা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাজারের চায়ের দোকান খোলা। এসব দোকানে কাছাকাছি অবস্থান করে অনেককেই গল্প করতে দেখা গেছে। অনেক কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণকে একসঙ্গে মোবাইল ফোন নিয়ে আড্ডা দিতে দেখা গেছে।

বরগুনা: জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ হাট-বাজারেই লোকে লোকারণ্য। স্বাভাবিক সময়ের মতোই তারা হাট-বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি তিনজন করে যাত্রী নিয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলগুলোও চলছে অহরহ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা