kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ঘরবন্দি কর্মহীন মানুষ

বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তা

সারা দেশে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ঘরবন্দি কর্মহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগেও দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন সহায়তা। করোনাভাইরাস বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ানো হচ্ছে। বাড়িতে বসে এসব সহায়তা পেয়ে দারুণ খুশি মানুষজন। বিস্তারিত আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—

গাড়িবহর দেখে দৌড়, এরপর...

গাড়িবহর গলি দিয়ে ঢুকতেই লোকজন দৌড়ে যে যার ঘরে ঢুকলেন। বাড়িতে ঢুকলেন জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের দেখে কেউ কেউ ভয়ে বলে উঠলেন, ‘স্যার, আমি কিছু করি নাই। কাজকাম নাই। ঘর থাইক্কা বাইর অই না। বাড়ির সামনেই দাঁড়াইছিলাম।’ জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব বললেন, ‘চিন্তার কিছু নাই। আপনারা বাড়ি থেকে বের হবেন না। নিয়ম মেনে ঘরে থাকুন। আমরা বাড়িতেই আপনাদের খাবারসামগ্রী পৌঁছে দেব ইনশাআল্লাহ।’ এরপর জেলা প্রশাসক তুলে দেন চাল, ডাল, তেল, সাবান, লবণ, আলু, পেঁয়াজ, মরিচসহ বস্তাভর্তি খাদ্যসামগ্রী। আর এসব পেয়ে দারুণ খুশি শহরের নবীনগরের ভ্যানচালক ইদ্রিস মিয়া (৬৭), গৃহকর্মী আছিয়া বেগম (৪৫), রশিদা বেগমসহ (৫৫) অন্যরা। ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘তিন দিন ধইরা কোনো রোজগার নাই। সব কিছু বন্ধ। আতে (হাতে) কয়ডা টেহা আছিল, এর মধ্যেই সব শেষ। খুব চিন্তার মইদ্দে আছিলাম। ডিসি সাবের খাবার জিনিসগুলা পাইয়া খুব শান্তি পাইলাম। এক-দুইবেলা কইরা খাইয়া পাঁচ-ছয় দিন চলুন যাব।’ গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসক ও সঙ্গের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শেরপুর শহরে কর্মহীন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার সময় এই চিত্র পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইউএনওরা কর্মহীন, অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাদ্য ও সাবান পৌঁছে দিচ্ছেন।

জেলা প্রশাসকের কাঁধে বস্তা

বাগেরহাটে গতকাল রবিবার থেকে সরকারিভাবে খাদ্যসহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আওয়ামী লীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা বিভিন্ন উপজেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রীর বস্তা-প্যাকেট তুলে দেন। জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদকে খাদ্যসামগ্রীর বস্তা কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুটতে দেখা গেছে। প্রতি প্যাকেটে ১০ কেজি করে চাল, এক কেজি ডাল, আলু, লবণ, তেল, সাবানসহ নানা সামগ্রী রয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের সৌজন্যে ফকিরহাটে এক হাজার ৬০০ ও মোল্লাহাটে এক হাজার ৪০০ দরিদ্র পরিবারকে খাদ্য ইত্যাদি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সহায়তা প্যাকেটের গায়ে লেখা, “কভিড-১৯ করোনা ‘আতঙ্ক’ নয়, সচেতন হউন। আমরা আপনাদের পাশে আছি।”

এত রাতে পুলিশ শুনে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম

শনিবার রাত প্রায় ১টা। যশোর শহরের শংকরপুর পশ্চিমপাড়ার বস্তি এলাকা। নীরবতা চারদিকে। পুরো পাড়াই ঘুমে। এমন সময় ভাঙাচোরা এক টিনশেডের টিনের দরজায় ঠক ঠক টোকা। সঙ্গে ‘ভাই, দরজাটা একটু খোলেন।’ ভেতর থেকে পুরুষ কণ্ঠ, ‘কে?’ বাইরে থেকে উত্তর : ‘আমরা পুলিশের লোক। দরজাটা একটু খোলেন।’ ‘পুলিশ’ শুনেই যেন নিস্তব্ধতা। এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষ। নিস্তব্ধতা ভেঙে বাইরে থেকে বলা হলো, ‘আমরা এসেছি পুলিশের পক্ষ থেকে। আপনাদের জন্য খাদ্যসামগ্রী দিতে।’ এরপর দরজা খুলে লুঙ্গি পরা, উষ্কখুষ্ক চুলের এক যুবক বের হলেন। অবাক চোখে বোঝার চেষ্টা করলেন বিষয়টি কী। তাঁর পেছনে ভেতর থেকে উঁকি দিলেন এক নারী। এ সময় যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন তাঁর হাতে তুলে দিলেন খাদ্যসামগ্রী ভরা ব্যাগ। ব্যাগে রয়েছে পাঁচ কেজি চাল, দুই কেজি ডাল, এক লিটার তেল, এক কেজি লবণ ও দুটি সাবান। আকস্মিক এসব পেয়ে কিছুটা হতবিহ্বল হলেও তাঁদের চোখে আনন্দের ঝিলিক। এই দুঃসময়ে রাতের বেলা পুলিশ তাঁকে দিয়ে গেল খাদ্যসামগ্রী!

ওই যুবকের নাম নাজিম উদ্দিন। পেশায় পিকআপের ড্রাইভার। স্ত্রী, সন্তান মিলে পাঁচজনের সংসার। যেদিন পিকআপ চালান সেদিন তাঁর আয় হয়। এক ট্রিপ দিলে পান ২৪০ টাকা। এই টাকায় তাঁর সংসার চলে। মাসে ঘর ভাড়া দিতে হয় এক হাজার ৫০০ টাকা। করোনাভাইরাস রোধে যানবাহন বন্ধের কারণে কয়েক দিন তিনি ঘরে। নাজিম বললেন, ‘এত রাতে প্রথমে পুলিশ শুনে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। উনারা আমাদের এই কষ্টের দিনে খাবার দিয়ে গেলেন। খুবই ভালো লাগছে।’ গভীর রাতে বাড়িতে বসে এমন খাদ্যসামগ্রী পেয়ে রিকশাচালক নূর ইসলাম দোয়া করলেন পুলিশ সুপারসহ সব পুলিশের জন্য। তিনি বললেন, ‘সব বন্ধ। বাইরে বাইর হই না। এই বিপদে যে ইনারা পাশে দাঁড়াইছে এইডা বিরাট ব্যাপার।’

এভাবে শহরের কয়েকটি এলাকায় শ্রমজীবীদের ২০০ পরিবারে খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়।

সড়কে পৌর মেয়র

জীবাণুনাশক স্প্রে, জনসচেতনতায় মাইকিং, নিম্ন আয়ের মানুষকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাঠে আছেন মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র মাহফুজুর রহমান রিটন। গতকাল দিনব্যাপী মেহেরপুর ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহিত গাড়ি নিয়ে শহরের প্রধান সড়কে জীবাণুনাশক স্প্রে করেন মেয়র। তিনি শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও সাবানের প্যাকেটও তুলে দেন।

সহায়তা পেল ২০০০ পরিবার

চুয়াডাঙ্গা জেলায় দরিদ্র যেসব পরিবার করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে কাজ করতে পারছে না তাদের খোঁজখবর নিয়ে ১০ কেজি চাল, চিঁড়া, ডাল, তেল, সাবান প্রভৃতি বিতরণ করা হচ্ছে। গত দুই দিনে প্রায় দুই হাজার পরিবারকে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রাদুর্ভাব যত দিন, সহায়তা তত দিন

ফেনীতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যত দিন, তত দিন কর্মহীন মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী। গতকাল প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার কর্মহীন দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন তিনি। সাংবাদিকদের তিনি জানান, জনসমাগম এড়াতে প্রতিটি ওয়ার্ডে জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একজন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্যাকেটে ২০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু, দুই কেজি মসুর ডাল এবং তেল রয়েছে। প্রতিদিন ১৮টি পিকআপে নিত্যপণ্য বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আকরামুজ্জমান, ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজি আলাউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিভিন্ন সংগঠনের সাহায্য

মুন্সীগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় ৯৫০টি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে সরকারি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত ১০০ টন চাল ও সাত লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে মুন্সীগঞ্জ এপেক্স ক্লাবসহ সেবামূলক বিভিন্ন সংগঠন মানুষের মাঝে মাস্ক, গ্লাভসসহ উপকরণ ও খাবার বিতরণ করছে।

কক্সবাজারে সহায়তা বিতরণ

কক্সবাজারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গতকাল শহরে নিম্ন আয়ের, কর্মহীন ও সুবিধাবঞ্চিত পাঁচ শতাধিক মানুষের মাঝে ২০ কেজি করে চাল ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ঘরে ঘরে এসব বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের ‘করোনা সহায়তা কমিটি’ শহরে দরিদ্র লোকজনের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে। আর কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইনের নেতৃত্বে পেশাজীবীদের নিয়ে করোনা সহায়তা কমিটি গঠিত হয়েছে। এ কমিটি আগামীকাল থেকে ঘরবন্দি সংকটে পড়া লোকজনের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করবে।

এমপি একরাম চৌধুরীর ত্রাণ

নোয়াখালীতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দিনমজুরসহ কর্মহীন সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গতকাল ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন স্থানীয় এমপি একরামুল করিম চৌধুরী। সদর উপজেলার ধর্মপুর ও নোয়াখালী ইউনিয়নে তাঁর পক্ষে এ ত্রাণ বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম শামসুদ্দিন জেহান।

সংক?টকা?লে মান?বিকতার পরীক্ষায় সাড়া দিন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (সম্প্রতি স্থগিত) আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, ‘জন?নেত্রী শেখ হা?সিনার নেতৃত্বাধীন জনবান্ধব সরকার ঘ?রে ঘ?রে খাদ্য পৌঁ?ছে দি?তে অঙ্গীকার ক?রে?ছে। বিত্তবান?দেরও উ?চিত, মানু?ষের জন্য খাদ্য সহায়তায় এ?গি?য়ে আসা। মান?বিকতার পরীক্ষা আজ আমা?দের সাম?নে। সংক?টকা?লে মান?বিকতার প?রিচয় পাওয়া যায়।’ গতকাল পূর্ব বাকলিয়া ও বক্সিরহাট ওয়ার্ডে খাদ্যসামগ্রী বিতরণকা?লে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নিজ উ?দ্যো?গে ছাপা?নো ক?রোনাভাইরাস প্রতি?রো?ধে নি?র্দেশনাপত্রও বিতরণ করেন।

এ ছাড়া গাজীপুরের শ্রীপুর, বরগুনার বামনা ও আমতলী, মাদারীপুরের রাজৈর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, কুমিল্লার চান্দিনা, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, নীলফামারীর সৈয়দপুর, বগুড়ার ধুনট, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নড়াইলের লোহাগড়া, রাজশাহীর বাঘা ও দুর্গাপুর, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা, হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও নবীগঞ্জ এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় খাদ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছে সরকারি প্রশাসন ও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা