kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

মানুষ বড় কাঁদছে...

দেশজুড়ে বাড়ছে সহায়তার হাত

নওশাদ জামিল   

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশজুড়ে বাড়ছে সহায়তার হাত

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।’ করোনার দুঃসময়ে অসহায় হয়ে পড়েছে মানুষ। করোনাভাইরাসে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। করোনা ঠেকাতে সরকারিভাবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘর থেকে বের হতে পারবে না কেউ। এমন নির্দেশ মেনে চলছে সবাই। কিন্তু খেটে খাওয়া দিনমজুরদের কী হবে। এক দিন কাজ না করলে মুখে খাবার ওঠে না যাদের, জীবিকার সন্ধানে সব কিছু উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত বাইরে তারা। ভ্যান, রিকশাচালক আর দিনমজুররা ঘুরছে কাজের সন্ধানে। জনশূন্যতার কারণে পাচ্ছে না তারা কোনো কাজ। এ অবস্থায় করোনার দুর্দিনে মানুষ দাঁড়াচ্ছে মানুষের পাশে।

করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সরকারি নির্দেশনা মেনে কর্মহীন হয়ে পড়া ১২০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছেন জাতীয় দলের সদ্য সাবেক হওয়া অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। গত শুক্রবার থেকে এ সাহায্য দেওয়া শুরু করেছেন তিনি। জানা যায়, নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলায় এক হাজার ২০০ পরিবারের মাঝে সহায়তা দিচ্ছেন মাশরাফি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দ্রব্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস রোধে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক, নার্স ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ২০০ পিপিইর ব্যবস্থা করেছেন মাশরাফি। পরে আরো ৩০০ পিপিইর ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

শুধু মাশরাফি নয়, এই দুঃসময়ে এগিয়ে এসেছেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ১৭ ক্রিকেটারের সঙ্গে কিছুদিন আগে শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ে সিরিজে খেলা আরো ১০ ক্রিকেটারসহ মোট ২৭ জন উদ্যোগ নিয়েছেন তহবিল গঠনের। খেলোয়াড়দের প্রত্যেকে দান করছেন তাঁদের এক মাসের বেতনের অর্ধেক। জানা যায়, এই ক্রিকেটাররা তহবিলে জমা করেছেন ৩০ লাখ টাকারও বেশি। এই মহতী কাজের উদ্যোক্তাদের অন্যতম বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল ফেসবুকে নিজের স্বীকৃত পেজে লিখেছেন, বেতনের ৫০ শতাংশ দিয়ে আমরা সহায়তা করছি। কর কেটে রাখার পর মোট থাকবে ২৫ লাখ টাকার কিছু বেশি। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এ দুঃসময়ে অসহায় মানুষ উপকৃত হবে।

ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ক্রিকেটার  মুশফিকুর রহিমও। সাবেক এই অধিনায়ক সমাজের বাকি পেশাজীবীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘করোনার বিরুদ্ধে জিততে হলে আমাদের এই উদ্যোগ হয়তো যথেষ্ট নয়। কিন্তু যাদের সামর্থ্য আছে সবাই যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসেন তাহলে প্রতিরোধ সম্ভব।’

শুধু ক্রীড়াজগতের মানুষ নয়, দেশের নানা শ্রেণির মানুষ এগিয়ে এসেছে মানুষের সহযোগিতায়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে রাজধানী ঢাকায় বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা ঘর থেকে বেরও হতে পারছে না, টাকাও রোজগার হচ্ছে না। আবার ঘরে থেকেও খাবার সংকটে। তাদের এখন ঘরে থাকলেও বিপদ বাইরে গেলে মহাবিপদ। করোনা সংকটকালে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ও সাঈদ খোকন। রাজধানীর নিম্নবিত্তের পরিবারের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তুলে দিচ্ছেন তাঁরা।

শ্রমজীবী মানুষ, যেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, যারা গ্রামে ঝুপড়ি ঘরে বা শহরে বস্তিতে বসবাস করে, তাদের পাশে এগিয়ে আসছেন বিত্তবানরা, রাজনীতিবিদরা। অনেকে নিজস্ব খরচে এলাকাভিত্তিক কয়েক বেলা বা কয়েক দিনের জন্য চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপণ্য তাদের জন্য সরবরাহ করছেন।

রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি যাঁরা বিত্তবান, যাঁদের সামর্থ্য আছে, এমন বিভিন্ন পেশার মানুষ যদি শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের নিজের গ্রাম বা শহরের আশপাশের গরিব দুঃখী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে এর চেয়ে বড় কাজ আর কিছু হতে পারে না। এরই মধ্যে মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। এখন কর্মজীবী-শ্রমজীবী বেকার মানুষদের, যাদের দিন আয় করে খেতে হয়, তাদের পাশে এগিয়ে আসছেন মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মনুষ্যত্ববোধের পরিচয় বিপদেই দিতে হয়। এখনই আপনাদের দেওয়ার সময়। আর গুজব সৃষ্টি করবেন না, মুনাফাখোর হবেন না। শুধু সরকার নয়, জনগণের রোষ থেকেও বাঁচবেন না। এই যুদ্ধ মানুষের জীবন রক্ষার। এ যুদ্ধে জিততেই হবে।

শ্রমজীবী, গরিব ও দুঃখী মানুষের পাশে সাধ্য অনুযায়ী সবাইকে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ১৪ দলের পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। কিন্তু ‘সরকারের একার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব না। তাই আসুন, সবাই দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াই।

করোনার দিনগুলোয় অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

মানবতার লড়াইয়ে একাত্তরের মতো এক মোহনায় মানুষ। তখন শত্রু ছিল দৃশ্যমান, এখন অদৃশ্য। শত্রু একটাই—শুধু বাংলাদেশেরই নয়, সমস্ত পৃথিবীর একটা মহাশক্তিধর জীবাণু করোনাভাইরাস। এ ভাইরাস থেকে মানুষের সুরক্ষার জন্য তারা নিজস্ব অর্থায়নে বিনা মূল্যে সাবান, মাস্ক, জীবাণুনাশক, লিফলেট বিতরণ ও সচেতনতামূলক মাইকিং করেছেন। মুসুল্লিদের সচেতনতার জন্য মসজিদে মসজিদে লিফলেট বিতরণ করছেন। পাশাপাশি ছিন্নমূল ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কাজ করছেন নানা শ্রেণির মানুষ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা