kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

শহরে সর্বত্র নিস্তব্ধতা, গ্রামাঞ্চল ঝুঁকিতে

সেনা টহল বেড়েছে, জোর দেওয়া হচ্ছে প্রবাসীদের কোয়ারেন্টিনে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শহরে সর্বত্র নিস্তব্ধতা, গ্রামাঞ্চল ঝুঁকিতে

গুলশান এলাকায় গতকাল সেনাবাহিনীকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধক ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দু-একটি গাড়ি জরুরি প্রয়োজন বা পণ্য নিয়ে চলাচল করছে। চারদিক প্রায় সুনসান। মানুষজনের দেখা মেলাও ভার। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সড়ক। অলিগলিতেও জটলা নেই। সন্ধ্যা নামলেই পরিণত হয় ভূতুড়ে নগরীতে। নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটির তৃতীয় দিনে গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকাসহ সব বিভাগীয় ও জেলা শহরে ছিল অবরুদ্ধ পরিস্থিতি।

করোনা মোকাবেলায় সরকারের ছুটি ঘোষণার পর গ্রামের বাড়ি গেছে অগুনতি মানুষ। মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্যের ভিত্তিতে ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক কোটি ১০ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছে। এক কোটি ১০ লাখ ফোন ব্যবহারকারীর সঙ্গে তাদের শিশুসন্তান বা যাদের ফোন নেই, তাদের সংখ্যা যুক্ত করলে এ সংখ্যা আরো বেশি। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে আছে চার লাখ ৮০ হাজার মানুষ, যারা বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, অল্পসংখ্যক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে পুলিশকে নিজের অবস্থান জানিয়েছে। গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত যারা ফিরেছে তাদের পাসপোর্টের ঠিকানায় খোজ নিয়ে কারা বাইরে আছে, তা শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে বাধ্য করার পাশাপাশি বাড়ি লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর আজিমপুর চায়না বিল্ডিং গলি হয়ে আজিমপুর কবরস্থানের দিকে যেতেই চোখে পড়ে সেনাবাহিনীর টহল গাড়ি। সামনে এগিয়ে দেখা যায় দুটি ট্রাক। একটিতে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদশ) ন্যায্য মূল্যের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অন্যটিতে কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে মৃত ব্যক্তির লাশ। সেনাবাহিনীর সদস্যরা মৃত ব্যক্তির ট্রাকে করে আসা প্রায় ৩০ জন মানুষকে একসঙ্গে যেতে বারণ করছিলেন। হাঁটার সময় তাদের দূরত্ব রেখে হাঁটতে হলো। টিসিবির ট্রাকটির সামনে দাঁড়িয়ে সেনা সদস্যরা লোকজনকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে অনুরোধ করছিলেন। 

আজিমপুর মোড়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) সামনে গিয়ে দেখা যায়, মিটারের কার্ড রিচার্জ করতে আসা মানুষের দীর্ঘ সারি। তবে একজন থেকে অন্যজন ছয় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল। গোল বৃত্ত দিয়ে এই দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে প্রায় আটটি বৃত্ত দেওয়া হয়েছে ইডেন মহিলা কলেজের ১ নম্বর গেট পর্যন্ত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে এ ধরনের উদ্যোগ বাড়ছে বিভিন্ন জেলায়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত বৃহস্পতিবার থেকে ১০ দিনের টানা ছুটি শুরু হয়েছে। মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মাঠে কাজ করছে সশস্ত্র বাহিনী। মূলত সামাজিক দূরত্ব ও প্রবাসীদের সংগনিরোধ বা কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। গতকাল সারা দেশেই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের জোরদার টহল ছিল।

ঘরে থাকার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাচ্ছে না। দিনে কিছু লোকজন ও যানবাহন চলাচল করলেও সন্ধ্যার পর একেবারেই কমে যায়, যে কারণে নীরব হয়ে যায় রাস্তাঘাট, মহল্লা। রাতে শহরগুলো হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ।

গত সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা সুধাংশু রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রামেও কোলাহল নেই। জরুরি দরকারে পারিবারিক অনুষ্ঠানও বন্ধ।

জানা গেছে, জগন্নাথপুর উপজেলার সাড়ে পাঁচ শ প্রবাসী বাড়ি এসেছে। তাদের মধ্যে ৩৮২ জন কোয়ারেন্টিনে আছে। বাকিদের মধ্যে কেউ লুকিয়ে আছে, কেউ পরিচিতজনদের বাসায় আছে। এ কারণে তাদের নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তবে প্রশাসন প্রবাসীবহুল এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গতকালও সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালিয়েছে। রাস্তা, নালা ও খোলা জায়গায় ছিটানো হয়েছে জীবাণুনাশক। একই সঙ্গে গরিব ও দুস্থ মানুষদের সহায়তায়ও এগিয়ে এসেছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বন্ধের তৃতীয় দিনে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো ছিল ফাঁকা। মুদি ও ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য কোনো দোকান খোলা দেখা যায়নি। মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বাড়ির সামনে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন স্থাপন করা হয়েছে বা সাবান-বালতি রাখা হয়েছে। প্রধান সড়কসহ বড় বড় রাস্তায় ছিল পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল। ছিল না গণপরিবহন।

সরকারি নির্দেশনায় গত বৃহস্পতিবার থেকে অফিস-আদালত, গণপরিবহন, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, ট্রেন, নৌযানসহ দেশের সব কিছুই বন্ধ রয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুসারে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। সীমিত পরিসরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যাংকও খোলা থাকছে সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া।

নভেল করোনাভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় তিন দেশ ছাড়া বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল আরো এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। আগে এই সময়সীমা ছিল ৩১ মার্চ পর্যন্ত, যা বাড়িয়ে ৭ এপ্রিল করা হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল ৪ এপ্রিল থেকে বাড়িয়ে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা